সড়কপথে যখন যানবাহনের সংখ্যা সড়কের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়, তখন যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না, এরকম অবস্থাকে যানজট বলা হয়। যানজটের দীর্ঘ সারি এক জায়গায় স্থির থাকে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যাত্রীদের বিরক্তি বাড়ে। আংশিকভাবে ট্রাফিকব্যবস্থাকেও যানজটের কারণ হিসেবে দেখা হয়। উন্নত ট্রাফিকিং ব্যবস্থা, সিগন্যালগুলোতে ওভারপাসের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘক্ষণ একপাশের গাড়িকে পার হতে সময় দিতে হয় এবং রাস্তার ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এমন সিগন্যাল ঢাকায় প্রতিটি সড়কে অন্তত চার-পাঁচটি করে রয়েছে। প্রতিটি পার হতে পাঁচ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে। সিগন্যালগুলোতে পাসওয়ে না থাকায় ও ব্যবহারের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজট থেকে ঢাকাবাসীর পরিত্রাণ সহজে মিলছে না।
মানুষ বাড়ছে, গাড়ি বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, কিন্তু সড়ক তো বাড়ছে না এই ঢাকায়। আজ থেকে ৫০ বছর আগে যে রাস্তাগুলো ছিল ঢাকায়, সেগুলোও দুপাশে বেদখল হয়ে সংকুচিত হয়েছে। এই ঢাকায় মানুষ এখন ২ কোটির বেশি। ঢাকার আয়তন ১,৩৫৩ বর্গকিলোমিটার আর বর্তমান রাস্তা ২,২০০ কিলোমিটার, যার মধ্যে ২১০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৫ হাজার লোকের বাস। এই বৃহত্ জনসংখ্যার জন্য যে রাস্তা প্রয়োজন তার এক-তৃতীয়াংশও নাই। যেটুকু আছে তার ১৫ শতাংশ অবৈধ দখলে। তাছাড়া ঢাকার অধিকাংশ রাস্তাই এখন বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের প্রতিবন্ধকতায় রয়েছে। পায়ে হাঁটার পথগুলো যখন অবরুদ্ধ তখন আর যাতায়াতের পথ থাকে না। আর এসব কারণে ট্রাফিক জ্যাম লেগেই আছে।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যাটিও প্রকট আকার ধারণ করছে। গত জুলাইয়ে বিশ্বব্যাংক একটি গবেষণা প্রকাশ করেছিল। তাতে বলা হয়, যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসাবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই শহরে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। বিশ্বব্যাংক বলছে এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে মানুষ।
যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, উন্নয়নকাজে বিকল্প রাস্তার ব্যবহার আগে থেকে জানিয়ে দেওয়াসহ রাস্তা প্রশস্তকরণ, বাড়ি করে কার পার্কিং না রাখা, রাস্তার দুপাশে কার পার্কিং করে রাস্তা দখলে রাখা ও সংকুচিত করা ইত্যাদি কারণে যানজট দিন দিন বাড়ছে। অবৈধ দখল, ফুটপাত, রাস্তা অবমুক্তকরণ, নির্বিঘ্নে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেওয়া, আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে এ থেকে রেহাই দিতে।
মিরপুর ৬০ ফিট রোডের ওপর ও শেওড়াপাড়া প্রধান সড়কে মনিপুর হাই স্কুল থাকায় একটা নির্ধারিত সময় (স্কুলে প্রবেশের সময় ও ছুটির সময়) এখানে যানজট লেগেই থাকে। ঠিক তেমন হলিক্রস কলেজ, রেসিডেন্টশিয়াল স্কুল ও কলেজে একই চিত্র। তবে মিরপুর রোডের রাস্তা চওড়া হওয়ায় রেসিডেন্টশিয়াল স্কুল ও কলেজের রাস্তায় ততটা যানজট লক্ষণীয় নয়। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম কখনো কখনো এতটাই নির্দয় ও অমানবিক হয় যে জরুরি অসুস্থ রোগী পরিবহনে অ্যাম্বুলেন্স চলার পথেও যানজট চরম বাধার সৃষ্টি করে।
ঢাকা মহানগরের মোট সড়কের প্রায় ৫০ শতাংশ জুড়েই চলাচল করে ব্যক্তিগত গাড়ি, অথচ এগুলো বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী। আর বাকি ৫০ শতাংশ বড় বাস লেগুনা, সিএনজি, উবার পাঠাও ও রিকশা মিলে প্রায় ৮৮ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে। তাহলে আমাদের করণীয় কী? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন উন্নত মানের ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক বাসসেবা চালু করাই আমাদের সর্বোত্তম বিকল্প হতে পারে।
সবশেষে এটুকুই বলতে পারি—আমাদের সাধ থাকলেও সাধ্য নাই। কিন্তু এই ক্ষুদ্র পরিসরেই নিজেদের সচেতন রেখে, অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করে চলতে হবে। বৃহত্ জনসংখ্যার এই ঢাকাকে জ্যামমুক্ত রাখতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
ঢাকা
