আফগান পরিস্থিতি কি রোহিঙ্গাসংকট সমাধানের পথ করবে?

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:২০

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করার পরপর গত ১৫ আগস্ট তালেবান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করে। সাম্প্রতিক এ অস্থিরতায় তালেবানবিরোধী আফগানদের কাবুল ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায় এবং নতুন এক শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি হয়। এখনো পর্যন্ত ১০/১২টি দেশ লক্ষাধিক আফগানিকে শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং সামনের দিনগুলোতে শরণার্থীসংকট আরো প্রকট হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও গত কয়েক বছরে প্রায় ২২ লাখ আফগানি শরণার্থী হিসেবে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাসংকট উদ্ভূত হওয়ার পর যেসব দেশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে, তাদের অনেকেই আজ তালেবান সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে মারাত্মক উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বর্তমান তালেবানের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তানসহ কাতারের দোহায় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক এবং অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রদর্শনপূর্বক আফগান ন্যাশনাল আর্মিকে হটিয়ে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখল; দুটোই তৈরি করেছে নতুন ইতিহাস ও পুরোনো রূপে নতুন হুমকি।

কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তির কাছে তালেবানের কাবুল বিজয় ‘মক্কা বিজয়’ মনে হলেও তত্ত্ববিদদের কাছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরাজয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বৈদেশিক শাসক হিসেবে ব্রিটিশদের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবাইকেই আত্মসমর্পণের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে আফগান ও তালেবানদের জাতীয়তাবোধের কাছে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আফগানিস্তান ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে জাতীয় প্রস্তুতি গ্রহণে ব্যস্ত, তখন ভারতসহ অনেক দেশকে নিরাপত্তা ইস্যুতে দূরদর্শিতার পরিচয় না দিয়ে আফগানিস্তানে ব্যাবসায়িক লগ্নিতে নিমজ্জিত থাকতে দেখা যায়। ফলস্বরূপ আফগানিস্তানে ভারতের মোট তিন বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রায় ৫০০টি প্রকল্প আজ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তাছাড়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দুটি দেশের ইন্ধনে তালেবানের সমগোত্রীয় ও ছায়া সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হুমকি তো থেকেই যাচ্ছে। একদিকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের মতো এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন; অন্যদিকে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জো বাইডেন সরকার ও এর গোয়েন্দা প্রধানের বৈঠক ও সমঝোতার বিষয়গুলো মিত্রদেশ হিসেবে ভারত, জাপান, থাইল্যান্ডসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান করে তুলছে। এদিকে রোহিঙ্গাসংকটের পর বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসবাদসহ অন্যান্য সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশে অবস্থানরত ১১ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এখন সেই নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জন্যেও গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে।

গত চার বছরে রোহিঙ্গাদের তাদের পৈতৃক ভূমি রাখাইনে প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাছাড়া মিয়ানমার জান্তার প্রতি চীন ও রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং ভারত, জাপান ও আসিয়ানভুক্ত কয়েকটি দেশের নীরব ভূমিকা সত্যিই অবাক হওয়ার মতো। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ পর্যন্ত ০৪টি প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও সেগুলো কেবল নিন্দা জ্ঞাপনেই সীমাবদ্ধ ছিল। যেমন জাতিসংঘের ৭৫তম সাধারণ অধিবেশনে ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক রেজুলেশনটির পক্ষে ভোট দেয় ১৩০টি দেশ, বিপক্ষে ০৯টি এবং ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে ২৬টি দেশ (ভারত, জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ)। আরসা নামক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তত্পরতা আপাতত লক্ষ করা না গেলেও আল-কায়েদা, আইএস, লস্কর-ই-তইবা এবং ভারতীয় মুজাহিদীনের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিষয়টিকে কেউ কেউ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বললেও সন্ত্রাসবাদ কখনো ভৌগোলিক বা রাষ্ট্রীয় সীমারেখা মানেনি বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। আফগান সরকারের পতনের পর হাক্কানি নেটওয়ার্ক, লস্কর-ই-তৈয়বা এবং জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো উগ্রবাদী সংগঠনের ভবিষ্যত্ কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের সর্বস্তরে আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ চলছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। আফগানিস্তানে ভারতের সামরিক তত্পরতাকে কটাক্ষ করে কাশ্মীর বিষয়ে তাদের একটি নিজস্ব অবস্থান থাকবে বলে তালেবানরা ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে। উল্লিখিত এসব সংগঠনগুলোর কর্মী নিয়োগের অন্যতম উত্স হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মতো হতাশাগ্রস্ত ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। আর মিয়ানমারের রাখাইনে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ভারতীয় বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এখন আরাকান আর্মির পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

মানবাধিকার ও বিনিয়োগের সঙ্গে ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি আভিধানিক ও প্রায়োগিক দু’অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো এতদিন এড়িয়ে গেছে ভারত, জাপান, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো। মিয়ানমারের যে সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের জীবন ও অধিকার হরণ করেছে, সেই নিষ্ঠুর বাহিনী ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে এখন মিয়ানমারের সাধারণ জনগণের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। অথচ এই সামরিক বাহিনী গঠিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গেই অনায়াসে ব্যবসা করে যাচ্ছে অনেক স্বার্থান্বেষী দেশ।

বর্তমান আফগানিস্তান পরিস্থিতি ভবিষ্যত্ নিরাপত্তার বিষয়গুলো নতুন করে ঢেলে সাজাতে একটি শিক্ষণীয় অধ্যায় হতে পারে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে ‘রোহিঙ্গাসংকট’ সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সবসময় ভারত, জাপানসহ আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহের জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা করছে। সর্বোপরি, ভারত, জাপানসহ আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহের উচিত মিয়ানমারে তাদের বিনিয়োগকে গতিশীল রাখতে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসা। পাশাপাশি সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি লাঘব করতে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের সব নাগরিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যত্ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য এখন এই আঞ্চলিক শক্তিগুলো আফগান ও রোহিঙ্গাসংকটকে আমলে নিয়ে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেয় তাই দেখার বিষয়।

n লেখক : অভিবাসন বিষয়ক গবেষক