শফিকুর রহমান রয়েল
ছয় শতাব্দীরও আগে থেকে এশিয়ায় বাণিজ্য চলছে সমুদ্রপথে। প্রথমে নির্ভর করতে হতো মৌসুমি বায়ুর ওপর, আর এখন সবই হয় ডিজেল চালিত জাহাজে করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়ার উত্থানের কাহিনীটা সমুদ্রনির্ভর। প্রথমে চমক দেখায় জাপান; পরবর্তীতে যুক্ত হয় দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুর। এরও পরে অর্থনৈতিক সাফল্য দেখানো শুরু করে উত্তর কোরিয়া ও মিয়ানমার ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার সকল দেশ। সব দেশই গ্রহণ করেছে তৈরি সামগ্রী রপ্তানির অর্থনৈতিক মডেল। সামুদ্রিক বিশ্বকে আলীঙ্গন না করলে চীনের উত্থান কল্পনাই করা যেতো না। চীন বলতেই এখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসংখ্য কন্টেইনার ভর্তি সারিসারি জাহাজ; যেনো জাহাজের মিছিল। জলপথের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই প্রাধান্য বিস্তারের নেশায় নৌশক্তি বৃদ্ধিতে এশিয়ার দুই সুপারপাওয়ার চীন ও ভারত সদাব্যস্ত; কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, নিজেদের মধ্যে সীমানা থাকা সত্ত্বেও গত শতাব্দীতে এশিয়ার তিন বৃহত্ রাষ্ট্র চীন, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেদের মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে মাথা ঘামায়নি। পারস্পরিক অবিশ্বাসের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবও কাজ করেছে এর পেছনে। কিন্তু সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে এখন। সড়ক, রেলপথ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে সংযুক্ত হচ্ছে এশিয়া। তুর্কমেনিস্তান থেকে কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান হয়ে চীনে গ্যাস আনার জন্য ৭ হাজার কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে বছর দু’য়েক আগে। দূরপ্রাচ্য থেকে চীনে তেল আনার জন্য হাতে নেয়া হয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট; স্থাপিত হচ্ছে ইরান-পাকিস্তান পাইপলাইন। মিয়ানমার থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চীনে গ্যাস নিতে কাজ করছে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুটি কোম্পানি।
সড়ক নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হচ্ছে। ভারত ও চীন প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশ পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ প্রসারিত করতে উদগ্রীব। চীনের নতুন হাইওয়ে কমপ্লেক্সে যোগ দিতে মুখিয়ে আছে মিয়ানমার। একইরকম উন্নয়ন ঘটছে সেন্ট্রাল এশিয়াতেও। রেলওয়ে পরিকল্পনা আরো সুদূরপ্রসারী। চীন ইতোমধ্যে তার রেললাইনকে নিয়ে গেছে তিব্বতের লাসা পর্যন্ত। ২০০৬ সালে চালুর পর থেকে সেই লাইনে যাতায়াত করেছে ১৫ মিলিয়নেরও বেশি লোক। এবার চীন তা সম্প্রসারণ করতে চায় নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ পর্যন্ত। হাইস্পিড রেলওয়ের ক্ষেত্রে চীন এখন পৃথিবীর সবচে’ দ্রুত ও দীর্ঘতম। তারা হাইস্পিড নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিতে চায় সারা এশিয়াতে তো বটেই, ইউরোপেও। তিনটি মূল রুটের সাহায্যে যুক্ত করতে চাইছে দুই ডজন দেশকে। এর সীমা দক্ষিণে সিঙ্গাপুর এবং পশ্চিমে জার্মানি পর্যন্ত (মাঝে টানেল থাকবে বেশ কয়েকটি)। সবকিছু ঠিকঠাক মতো চললে ২০২৫ সাল নাগাদ ট্রেনে চড়ে সাংহাই থেকে লন্ডন যাওয়া যাবে দুই দিনে।
এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। তবে একথা ঠিক যে, এশিয়াকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করার জন্য আন্তর্মহাদেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিকল্প নেই। এশিয়ায় মহাদেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পচ্ছে দ্রতগতিতে; বাকি বিশ্বের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে। মাত্র ২৫ বছর আগেও ভারত ও চীনের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বলতে তেমন কিছুই ছিল না। অথচ এখন চীনই ভারতের সবচে’ বড় ব্যবসায়িক সঙ্গী। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। চীনেই সবচে’ বেশি খনিজদ্রব্য রপ্তানি করে ভারত। সেন্ট্রাল এশিয়াতেও একই অবস্থা। ওই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে চীনের ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ ১৯৯০ সালে ছিল ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৮ সালে তা পৌঁছে ১২ বিলিয়ন ডলারে। মধ্যপ্রাচ্যে সবচে’ বেশি তৈরি সামগ্রী রপ্তানি করে চীন।
উল্লেখ্য, যোগাযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে মানসিক ব্যাপারটিও জড়িত। দুর্গম অঞ্চলের লোকজন সমুদ্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে পারলে নিজেদেরকে আর বিচ্ছিন্ন ভাবে না। তখন নিজেদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারের পাঠানোর জন্য তত্পর হয়। তাতে কমে যায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। চীন ও ভারতে এই সমস্যা তীব্র। প্রতিবেশী ছোট দেশগুলো কীভাবে সাড়া দেবে, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে সকল কিছু।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে গত দুই বছরে ভারত ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের উন্নয়ন ও যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে উভয় দেশই একমত। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরালো করার ব্যাপারে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গত বছর আলোচনায় বসেছিলেন কুটনীতিকরা। এতে নেপালের মধ্য দিয়ে ভারত থেকে চীন পর্যন্ত ট্রান্স-হিমালয়ান রেললাইন বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই আলোচনাচক্রে নেপালের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী প্রকাশ চন্দ্র লোহানী তার দেশকে মাঝে রেখে ভারত-চীন মৈত্রী সুদৃঢ় করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছর নাগাদ ভারত ও চীনের বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫ হাজার কোটি ডলার।
