গত কয়েক বত্সর ধরিয়া বাংলাদেশে নিরাপত্তার কারণে ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন বা সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার বাড়িয়াছে। শুধু অফিস-আদালতই নহে, আবাসিক ভবন ও রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার দেখা যায়। সিকিউরিটি গার্ড থাকিলেও অধিকতর নিরপত্তার জন্য ভবন মালিকগণ বা বিভিন্ন সমিতির লোকজন এবং বসবাসের বাড়িতেও এই ধরনের ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছেন। সড়ক-মহাসড়কে চুরি, ছিনতাই, সড়ক দুর্ঘটনা প্রভৃতির প্রকৃত অবস্থা জানিতেও এইরূপ ক্যামেরা বসানো হইতেছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে। শুধু ঢাকা শহরই নহে, ঢাকার বাহিরেও ইহার ব্যবহার বাড়িতেছে যাহা একটি আশাব্যঞ্জক দিক নিঃসন্দেহে। সিসিটিভি ক্যামেরা অপরাধপ্রবণতা কমাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, জনস্বার্থে একবার সিসিটিভি ক্যামেরা বসাইয়া রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না। ইহাতে ইহার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয় এবং সরকারের অত্য অপচয়ই হইয়া থাকে। বিশেষ করিয়া সরকারি অফিস বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা অধিক হারে পরিলক্ষিত হয় যাহা মোটেও কাম্য নহে।
ইত্তেফাকের এক খবর অনুযায়ী চট্টগ্রামের মিরসরাই পৌরসভায় অপরাধ দমনে নজরদারি বাড়াইতে বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয় সিসিটিভি ক্যামেরা। কিন্তু পৌরসভা সদরের ৩০টি স্পটে লাগানো অধিকাংশ ক্যামেরাই আজ নষ্ট বা অকেজো হইয়া গিয়াছে। মিরসরাই থানার অনুরোধে এই ক্যামেরাগুলি স্থাপন করে পৌরসভা। এখন এই প্রেক্ষিতে সেইখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হইতেছে। সমপ্রতি কয়েকটি বাসা ও দোকানে চুরির ঘটনা ঘটিয়াছে। কিশোর গ্যাংয়ের অপতত্পরতা ও ইভটিজিংয়ের ঘটনাও বাড়িয়াছে। কিন্তু ফুটেজ না পাওয়ায় অপরধীকে শনাক্ত করা যাইতেছে না। অপরাধ তদন্তে মিলিতেছে না সুফল। আসলে এইখানে সিসিটিভি ক্যামেরাগুলি কে দেখভাল করিবেন তাহা লইয়া একপ্রকার টানাপোড়েন সৃষ্টি হইয়াছে। ক্যামেরার সব নিয়ন্ত্রণ ও কন্ট্রোল রুম থানায়। চার বত্সর ধরিয়া পৌরসভা নিজ খরচে ক্যামেরাগুলোর সার্ভিসিং করিলেও তাহারা আর কতদিন করিবে ইহা লইয়াও প্রশ্ন উঠিয়াছে। এইখানে সিসিটিভি ক্যামেরার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থানাপুলিশকেই নিতে হইবে। বাজারে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল থাকিলে অনেক অপরাধই কমিয়া যাইবে। কেননা ইহাতে অপরাধীরা অপরাধ করিতে ভয় পায়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভবন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, আবাসিক ভবনের পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যোগে রাস্তাঘাটেও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হইতেছে। এইসব ক্যামেরায় টানা তিনমাস পর্যন্ত ভিডিও সংরক্ষণ করা যায়। ঢাকার প্রধান সড়কগুলির বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করিয়াছে মহানগর পুলিশ। অনেক ক্ষেত্রে কর্মজীবী দম্পত্তি যাহাদের শিশুসন্তানকে বাসায় কাহারও নিকট রাখিয়া আসিতে হয়, তাহারাও বাসার ভেতরে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাইতেছেন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে অফিস হইতেই বাসার ওপর নজরদারি রাখিতেছেন। অর্থাত্ এই সুবিধা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনিয়াছে।
সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে আমেরিকায় বসিয়া থাকিয়া বাসার চোর ধরিবারও দৃষ্টান্ত রহিয়াছে ঢাকা শহরে। বর্তমানে ‘রিয়েল টাইম সার্ভিলেন্স মনিটরিং’ নামে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহূত হইতেছে। ইহাতে নিরাপত্তার বিষয়টি যে কেহ চাহিলে যে কোনো স্থান হইতে তাত্ক্ষণিকভাবে দেখিতে পারেন। চাহিলে নিজের স্মার্টফোন কিংবা ট্যাবলেট হইতেও অ্যাপের মাধ্যমে নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা সম্ভব। ১৯৪২ সালে জার্মানিতে প্রথম সিসিটিভি ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়। বাংলাদেশে ২০১৩ সাল হইতে ইহার বাজার বাড়িতে শুরু করে। তবে জনস্বার্থে ও নিরাপত্তায় রাস্তাঘাটসহ যে সব স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হইয়াছে, সেইগুলি নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করিতে হইবে সংশ্লিষ্ট মহল ও কর্তৃপক্ষকে। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রদর্শন কাহারও কাম্য হইতে পারে না।
