এক সময় যে গ্রামের মানুষ অভাব-অনটন আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ছিল, বেঁচে থাকার তাগিদে কাজের আশায় গ্রাম থেকে শহরে ছুটত, তারা আজ অভাব-অনটনকে জয় করে সামনের দিকে পা বাড়াচ্ছে। বলছি ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার বানিয়াকাজী গ্রামের কথা। নিজেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার মন্ত্র এই গ্রামের প্রত্যেকের জানা। যার ফলে বানিয়াকাজী গ্রামের এক একটি পরিবারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে আশেপাশের দুই থেকে তিন গ্রামের মানুষ।
করোনাকালের এই বিশ্বমন্দার মধ্যেও এই গ্রামের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জীবনযাপন করতে পারছে। অর্থনৈতিক কোনো বিপর্যয় এই গ্রামে দেখা দেয়নি। আর এর একমাত্র কারণ মাছ ধরার দেশীয় পণ্য ‘দারকি’ তৈরির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করা। স্থানীয়ভাবে যাকে ‘বুচনা’ বলা হয়। আগে চার-পাঁচটি পরিবার এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও বর্তমানে বানিয়াকাজীসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে দারকি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। দারকির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর অনেক পরিবারই শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরেছে।
পুঁজি ৫০০ টাকা হলেও এই ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। দারকি তৈরিতে প্রয়োজন হয় বাঁশ এবং কালো মোটা লাইলন সুতা। দারকি তৈরিতে তেমন খরচ হয় না। একটি ভালো জাতের বাঁশ দিয়ে চার থেকে পাঁচটি দারকি তৈরি করা সম্ভব। আর সুতাও বেশি প্রয়োজন হয় না। মজুরিসহ ৫০-৬০ টাকার মধ্যেই একটি দারকি তৈরি হয়ে যায়। আর বুননকৌশল যথাযথ রক্ষা করলে প্রতিটি দারকি ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব। ছেলে বুড়ো সবাই অতি সহজেই দারকি তৈরি করতে পারে। কাঠের তৈরি বিশেষ ধরনের একটি জিনিসের সাহায্য বাঁশের চিকন শলা আর সুতার মারপ্যাঁচে আস্তে আস্তে সুন্দর এক চাঁটা তৈরি হয়। তারপর বাঁশের শক্ত কাঠি দ্বারা হাতের সুনিপুণ দক্ষতায় তৈরি হয়ে যায় মাছ ধরার দেশীয় জিনিস, নাম যার দারকি। সাধারণত নিযুক্ত শ্রমিকেরা বাঁশের শলা আর সুতা নিয়ে চাঁটা তৈরি করে। চাঁটার আকার দিয়েও শ্রমের মজুরি হিসাব করা হয় ‘আনি’ দ্বারা (স্থানীয়ভাবে দারকির সাইজ নির্ধারণ করতে ‘আনি’ হিসাব করা হয়)। তারপর শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁটা সংগ্রহ করে মালিক দারকির রূপ দিয়ে বাজারজাত করেন। বিশেষ করে প্রতি মঙ্গলবার গ্রামে বিরাট কর্মযজ্ঞ চলে, কারণ মুক্তাগাছা পৌরসভার স্বাভাবিক হাট বসে প্রতি বুধবার। হাটে উপস্থিত বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি এবং খুচরা ক্রেতার মাধ্যমে দারকি বিপণনের ব্যবস্থা হয়।
দারকি আমাদের দেশের ঐতিহ্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে দেশীয় পণ্য আজ ধ্বংসের মুখে। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে হারিয়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে এধরনের গ্রামীণ পণ্য। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মাছ ধরার দেশীয় পণ্য দারকির বিরাট বাজার হতে পারে সারা দেশে।
মো. আফসারুল আলম মামুন
