ঋতু : শরত্

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:২৯

শরত্ মানেই কখনো রোদ, কখনো মেঘ আবার স্বচ্ছ নীল আকাশ। দিনমান আকাশে পেঁজাতুলো মেঘমালা। একদিকে রোদ অন্যদিকে বৃষ্টি। এমনই আবহ নিয়ে রংধনুর সাত রঙে সাজে শরত্। বিল-ঝিলে পানকৌড়ি আর সারসের সমারোহ। কচুরিপানার নীল-বেগুনি ফুল। হাওরের তীর ঘেঁষে রূপসী হিজল লালফুলের বেণি গাঁথে। বাতাসে টুপ করে বেণি থেকে ফুলের পাপড়ি জলের বুকে খসে পড়ে। শাপলা আর পদ্মপাতা জলময়ূরীকে কাছে ডাকে। শাপলা, পদ্ম আর কলমিলতার হাসিতে রূপসী হয় বিল-ঝিল। নদী ডাকে পালতোলা নায়ের মাঝিকে। মেঘের সঙ্গে সন্ধি করে—এ যেন জলের গল্প শোনার ক্ষণ।

শরতের রাত কখনো ঘন আঁধারে ছেয়ে যায়। কখনো কোজাগরী চাঁদের আলোয় হেসে ওঠে। রাতের আঁধারে জোছনার মেকাপে, নয়তো জোনাকির আলো ঝলমল করে। সেই আলোর পরশে সবুজ পাতার ফাঁকে সেজে ওঠে নিশিপরীরা। এই নিশিপরীরা যেন একেকটা দুখী রাজকন্যার গল্প। ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই মনের দুখে আত্মাহুতি দেয় সেই কন্যারা। শিশিরসিক্ত ভোরের দূর্বাঘাসে পড়ে থাকে তারা। কে জানে কী এমন অব্যক্ত বেদনা তাদের মনে? সেই অব্যক্ত বেদনা নিয়েই ঝরে পড়ে সেসব নিশিপরী শিউলি মেয়েরা! তবু তাদের ভালোবেসে আঁচলে তুলে নেয় সদ্য কিশোরী। হলদে বোঁটায় সুঁই-সুতোর ফোঁড়ে গড়ে মালা।

দোয়েল, বুলবুলি আর ফটিকজল আগমনী দিনের গান শোনায়। দখিনায় ধানের জমিতে সবুজের তরঙ্গ বয়ে যায়। নদীর চর, খালের দুধার আর অবারিত মাঠ যেন শিল্পীর ক্যানভাসে ধরা দেয়। মাঠে মাঠে দোল খায় শুভ্র কাশফুল।

তাল, সুপারি আর নারকেল গাছে শৈল্পিক বুননে ব্যস্ত হয়ে ওঠে বাবুইপাখি। তালগাছে দেখা যায় তেলরঙে আঁকা ছবির মতোই পাকা তাল। সেসব তাল টুপ করে ঝরে পড়ে তালদিঘিতে। রাতে মায়ের হাতের সযত্ন ছোঁয়ায় তৈরি হয় তালের পিঠা। সেই পিঠার ঘ্রাণে রাতের বাতাস আমোদিত হয়ে ওঠে। জোনাকির আলোয় কোরাস গায় ঝিঁঝির মেয়েরা। কখনো কখনো রাতের শেয়াল হল্লা করে ডেকে চলে। দূর থেকে ভেসে আসে দোলনচাঁপার ঘ্রাণ।

শরতের শেষবেলায় তাপের তেজ কমে আসে। ধীরে ধীরে কিছুটা হিমেল হাওয়ার স্পর্শ অনুভূত হয়। বিকেলের দিকে আকাশ নিকেল রঙে সেজে ওঠে। তখন সুদূর সাইবেরিয়া আর এজিয়ান তীর থেকে বাংলার জলাশয়ের উদ্দেশ্যে ডানা মেলার প্রস্তুতি নেয় হাজারো পাখি। তখন যেন কবির কানে এসে কেউ গোপনে বলে যায়—

বহুদূর থেকে ভেসে আসে কত মধুময় স্বর,

আকাশের দিকে চেয়ে দেখো—পাবে সে খবর।

তুমি কি শুনতে পাও ডানা ঝাপটানো সুরে

হেমন্ত-শীত, বসন্ত নিয়ে কারা এলো উড়ে?

শরতে মহা ধুমধামে শুরু হয় শারদীয় উত্সব।

নবান্ন উত্সবের ঋতু হেমন্তকে স্বাগত জানিয়ে বিদায় নেয় শরত্।