বাদ্যযন্ত্রে জীবনের জয়গান

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৫৫

মো. শফি আলম, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া গ্রামের মনিদাশপাড়াকে সবাই ঢাক-ঢোলপাড়া হিসেবেই চেনে। করোনকালের স্থবিরতা কাটিয়ে মনিদাশপাড়া জেগে উঠেছে নব উদ্যোমে। দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ঢাক, ঢোল, ডুগি, তবলা আর কঙ্গ তৈরির কাজে এ পাড়ার সবাই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বাড়ির গৃহবধূদেরও যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। তাদের সময় কাটছে ডুগি তবলার বিড়া বানিয়ে। এ পাড়ায় কেউ অলস বসে না থেকে ছোট-বড় সবাই কোনো-না-কোনো কাজ করেন। ঘর-গৃহস্থালির কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা লেগে যান এই কাজে। দিন-রাত চলে বিরামহীন কাজ। মনিদাশপাড়ার প্রবীণ কমল চন্দ্র দাস বলেন, পূর্বপুরুষদের এই পেশা ধরে রাখতে তিনি চার যুগেরও বেশি সময় ধরে ঢাক-ঢোল তৈরির কাজে জড়িত। তিনি আরো বলেন, মনিদাশপাড়ায় প্রায় ৩৫টি পরিবারের শতাধিক ব্যক্তি এই ঢাক-ঢোল বানানোর কাজে জড়িত। কেউ পৈতৃক পেশা হিসেবে আবার কেউ দিনমজুর হিসেবে এই কাজ করে থাকেন।

পাড়ার আরেক প্রবীণ ব্যক্তি গোকুল চন্দ্র দাস বলেন, শ্রীকান্ত বাবু নামে এক অভিজ্ঞ বাজনাদার গুরুর কাছ থেকে তাদের  পূর্বপুরুষদের কয়েক জন এই কাজ শিখেছিলেন। পরবর্তীকালে অনেকেই এই কাজে জড়িয়ে পড়েন। পাড়ার সবাই এই কাজ করেই সংসার চালান। এখানে পাইকারি ও খুচরা বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করা হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বড় বড় বাদ্যযন্ত্রের শোরুমে—এমনকি বিদেশ থেকেও অর্ডার আসে এখানে। সরজমিন বালিয়াখোড়ার মনিদাসপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠোনে ঢোল তৈরির পর রঙের প্রলেপ দিচ্ছিলেন মানিক চন্দ্র দাস ও চিত্ত রঞ্জন দাস। পাশেই কাপড় আর সুতা দিয়ে ঢোলের বিড়া বানানোর কাজে ব্যস্ত গৃহবধূ যমুনা রানী দাস। আশপাশের বাড়িগুলো থেকেও আসছে ঠুংঠাং শব্দ।

মানিক চন্দ্র দাস ও চিত্ত রঞ্জন দাস জানান, তারা  প্রায় ২০ বছর ধরে এই কাজে জড়িত। বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে তারা আম, নিম, রেইনট্রি কড়ই ও শিমুল কাঠ ব্যবহার করে থাকেন। তারা ঢাক, ঢোল, ডুগি, তবলা, কঙ্গ, হাত বাওয়া, নাল, খমগ ও বাচ্চাদের ঢোল তৈরি করে থাকেন। এখানে কাঠ ও আকারভেদে বাদ্যযন্ত্রের দাম বিভিন্ন রকমের। তবে একটি ঢাক ৩ হাজার টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা, তবলা ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, হাত বাওয়া ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, একেকটি নাল দেড় থেকে ৩ হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়ে থাকে। একেকটি যন্ত্র তৈরি করতে প্রায় চার থেকে সাত দিন পর্যন্ত লেগে যায়। গৃহবধূ যমুনা রানী দাস বলেন, তারা বানান ডুগি-তবলার বিড়া। গৃহস্থালির কাজ শেষে তারা লেগে যান এই কাজে। আর পূজা এলে তো কথাই নেই। ব্যস্ততা বেড়ে যায় বহু গুণ। নাওয়া-খাওয়ার সময়ও পাওয়া যায় না। সরকারি দেবেন্দ্র বিশ্ববিদ্যাল কলেজের অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী আকাশ চন্দ দাস বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি এ কাজে তিনি বাবাকে সহায়তা করেন।