ভারতের মেঘালয়ে পাহাড়ধস
হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী, সিলেট অফিস ও
আলম সাব্বির, তাহিরপুর
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের পার্শ্ববর্তী ভারতের মেঘালয় রাজ্যে পাহাড়ধসে এর পাদদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশের ৫০ সহস্রাধিক মানুষের জীবন ও জীবিকা এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি। এরই মধ্যে কেউ বাড়িহারা, কেউ-বা জমিজিরাত হারিয়ে চিরতরে পথে বসেছেন। সীমান্ত খুঁটি ১২০০ এস ৫ সংলগ্ন মেঘালয়ের পাহাড়ধসে নিচের গ্রামবাসীর জীবনে যে বিপর্যয় চলছে, তা কবে শেষ হবে কেউ জানে না। প্রতি বছর এ ঘটনা ঘটছে। সীমান্তের ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা অম্ল পানি, বালু ও কয়লার ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে নদী, হাওর ও জলাশয়ে। মাছ, পাখি, চুনাপাথর, বালু এবং বিশাল শস্যভান্ডারে ভরপুর তাহিরপুর উপজেলার জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
গত ১৬ আগস্ট ভারতের মেঘালয়ে পাহাড়ধসে গৃহহারা ১২ পরিবার দুই মাস পরও মাথা তুলতে পারেনি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কোনো সাহায্য পায়নি। কৃষিজমি বালুচাপা পড়ায় অনেকেই বেকার হয়ে গেছেন। তাহিরপুর উপজেলা এসিল্যান্ড মো. আলাউদ্দিন জানালেন, চানপুর রজনী লাইন এলাকায় পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির সঙ্গে বালু ও পানির নিচে ঢাকা পড়ায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপন ও বালু অপসারণে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে যাওয়া হয়নি তাদের। উপজেলা কৃষি অফিসার হাসান উদ-দৌলার বক্তব্যও অনেকটা দায়সারা। কী পরিমাণ কৃষিজমি বালুতে চাপা পড়েছে বলতে পারেননি তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢলে চানপুর গুচ্ছগ্রামের ১৫টি ঘর মাটির সঙ্গে মিশে ৫০-৬০ জন অন্যের আশ্রয়ে। সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা বালু ও পাথরে ভরে গিয়ে নয়া ছড়া খালের অস্তিত্ব নেই। সড়ক ভেঙেচুরে খানখান। চানপুর ব্রিজের নিচের খালটি বালুর সড়কে পরিণত হয়েছে। ১৫টি মাছের পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। পানিমিশ্রিত বালুর স্রোত বস্তা দিয়ে ঠেকিয়ে সবুজ ফসলের চারা আগলে রেখেছেন কৃষক। অনেক ফসলি মাঠ বালুচাপা পড়েছে। চানপুরের সচ্ছল কৃষক আবদুল খালিক জানালেন, তার এক কিয়ার কচুখেত, দুই কিয়ার ফসলি জমি ও পুকুরের মাছ বালুচাপা পড়েছে। তিনি জানান, সব মিলিয়ে অন্তত ৪০০ একর জমি এবার নতুন করে বালু ও পাথরে ঢাকা পড়েছে।
গ্রামবাসী জানান, এবার পাহাড়ধসে নতুন করে অন্তত ৪০০ একর জমি বালু ও পাথরে চাপা পড়েছে। এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, মেঘালয়ে পাহাড়ধসের বিষয়টি আন্তঃরাষ্ট্রীয়। তাই বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক আলোচানার মাধ্যমে সমাধান প্রয়োজন। সেখানকার মানুষের অবস্থা করুণ। তিনি কৃষিজমি উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য জোর দাবি জানান।
‘পাথর এখন গলার কাঁটা’ :এবার পাহাড়ধসে গড়িয়ে আসা বড় বড় পাথর, চুনাপাথর এখন গলার কাঁটা—এই মন্তব্য করে বড়দল ৪ নম্বর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার সম্রাট মিয়া বলেন, পাথর উত্তোলন নিষেধ। তাই তারা তুলতে পারছেন না পাথর।
চানপুর, রজনীলাইনসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ বলেন, ভেসে আসা পাথর ও চুনাপাথর তুলে বিক্রয় করতে পারলে আপাতত ক্ষতিগ্রস্তদের জীবিকার উপায় হতো। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় নেতা এন্ড্রো সলমার স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বলেন, ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ধসিয়ে কয়লা ও পাথর উত্তোলন করায় পাহাড়ধসের ঘটনা বাড়ছে। ক্ষতিতে পড়েছে পাদদেশের রজনী লাইন, বড়ছড়া, বুরুঙ্গাছড়া, রাজাইছড়া, লাকমাছড়া, গারোছড়া, জঙ্গলবাড়ীছড়া। একই সঙ্গে কয়লামিশ্রিত পানিতে অতিরিক্ত সালফার জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। যাদুকাটা এখন মাছশূন্য। টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের রেস্টহাউজের মাথার ওপর মেঘালয়ের লাইলেড এলাকায় এস্কাভেটর দিয়ে যেভাবে পাথর ও চুনাপাথর উত্তোলন হচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রাজা তাহিরপুরের দুর্যোগ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি কামনা করে বলেন, ‘যেভাবে বালু আসছে, পাহাড়ধসের ঘটনা বাড়ছে, তাতে মনে হয় আমরা বড় ক্ষতির দিকে এগোচ্ছি।’
