একসময় ‘ডাকবাক্স’ শব্দটি খুবই পরিচিত একটি শব্দ ছিল। একে অপরের ভাব বিনিময়ে এবং খবরাখবর পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হতো চিঠি। হলুদ খামের ভেতর নিজের আবেগ, ভালোবাসামিশ্রিত একগুচ্ছ শব্দভান্ডারে ভরে উঠত চিঠির পাতা। বহুপথ পাড়ি দিয়ে লাল ডাকবাক্সে চিঠি জমা দিয়ে ফিরতে হতো বাড়ি। তার পরেই শুরু হতো চিঠির প্রতিউত্তরের আশায় অপেক্ষার প্রহর গোনার দিন। অপেক্ষায় থাকতে হতো খাকি পোশাক পরিহিত ডাকপিওনের সাইকেলের টুংটাং শব্দ শোনার জন্য। সেসব দিন আজ শুধু স্মৃতির পাতায় উঠতে বসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার আর আধুনিকায়নে হারাতে বসেছে ডাকবাক্স। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ভাবের বিনিময়ে আর দেখা যায় না চিঠির ব্যবহার। তবে সরকারি বেসরকারি অফিসের প্রয়োজনে এখনো এটির প্রচলন থাকলেও আধুনিক কুরিয়ারের প্রতি ঝুঁকছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
চিঠি ছিল বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য সম্পদ। পূর্বে একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য পাঠানো হতো ডাকবাহক। তবে দূরবর্তী অঞ্চলে খবর পাঠানোর জন্য ব্যবহূত হতো পায়রা বা কবুতর। পায়রার পায়ে বেঁধে দেওয়া হতো ছোট সংবাদের চিরকুট, যা পৌঁছে যেত নির্দিষ্ট গন্তব্যে। সম্রাট চেঙ্গিজ খাঁ তার অধিকৃত রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন এই মাধ্যম ব্যবহার করে। তারপর দিনের পরিবর্তনে ডাকব্যবস্থায় এসেছে নতুন সংযোজন। জানা যায়, দিল্লির প্রথম সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের শাসনকালে ডাকব্যবস্থায় যুক্ত হয় ঘোড়ার ব্যবহার। পর্যটক ইবনে বতুতার বিবরণী থেকে জানা যায়, সেই সময়ে দুইভাবে ডাকব্যবস্থার প্রচলন ছিল। এক পায়ে হেঁটে সাধারণ ডাক বিলিবণ্টন ও অন্যটি হলো জরুরি অবস্থায় বহিরাগতদের আক্রমণের সংবাদ অথবা যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের সংবাদ প্রেরণ করা হতো ঘোড়ার ডাকব্যবস্থার মাধ্যমে। শেরশাহর শাসনকালে ভারতীয় ডাকব্যবস্থার আমূল সংস্কার ঘটে। তিনি ডাকব্যবস্থার সুবিধার্থে নির্মাণ করেছিলেন সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু প্রদেশ পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তা।
প্রযুক্তির উত্কর্ষে চিঠি বা ডাকবাক্সের যুগ হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে এখনো চিঠি লেখে মানুষ, সেটা ইমেইল, মোবাইল কিংবা এসএমএসে। মুহূর্তের খবর মুহূর্তে পৌঁছে দিচ্ছে এসব মাধ্যম। বিশেষ করে বর্তমানে চিঠির জায়গা দখল করেছে ফেসবুক, ম্যাসেনজার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবারের মতো অ্যাপ্লিকেশন। কোনো কিছু জানানোর প্রয়োজন হলেই সেটা ম্যাসেনজারে লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছে প্রেরক। ওদিকে সেকেন্ডের মধ্যে সেই বার্তাটি গ্রহণ করছে প্রাপক। নিজের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশে সব থেকে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুকের মত সোশ্যাল মিডিয়াগুলো। ইচ্ছা হলেই সব কথা লিখে দিচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ সেটি পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মন্তব্যও করছে পাঠকরা;
কিন্তু হাতে লেখা একটি চিঠি যেভাবে লেখকের আবেগ অনুভূতি প্রাপককে ছুঁয়ে দিত, বর্তমানের এ মাধ্যমগুলো কি পারছে সেটি করতে? হয়তো-বা না। তবে সময়ের প্রয়োজনেই আস্তে আস্তে মানুষ এগুলোর প্রতি ঝুঁকে বসেছে।
আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা পারি লাল রংয়ের ডাকবাক্সের সেই যৌবন ফিরিয়ে আনতে। সেবা ও মানে বেশ কিছুটা আধুনিকায়ন করা হলে জেলা, উপজেলার ডাকঘরগুলো বেশ ভালো চলবে। কাজের পরিধিও বাড়বে। একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ডাকব্যবস্থার আধুনিকায়নের কোন বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারি অধিদপ্তরের সব লিখিত যোগাযোগব্যবস্থায় ডাকবিভাগকে ব্যবহার করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার যুগে সময়ের বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে। দ্রুততার সঙ্গে আদান-প্রদানের কাজটি করতে পারলে আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠবে এ মাধ্যমটি। এছাড়া এ সেক্টরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ডাকপিওনদের বেতনভাতার বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। সবমিলিয়ে ডাকবিভাগকে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। পুনরায় এ পথে গতি ফেরাতে সংগঠন, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও বিনিয়োগে বড় পরিবর্তনের বিকল্প নেই। আর এ পরিবর্তনেই প্রাণ ফিরে পাবে আমাদের প্রতীক্ষিত লাল ডাকবাক্স।
n লেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।
