বরিশালের বিভিন্ন নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের নিমিত্তে যৌথ জরিপের কার্যক্রম আড়াই বছরেও সম্পন্ন না হওয়ায় দখলদাররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কীর্তনখোলা নদীর উভয় তীরে প্রভাবশালী মহল বৃহত্ প্রতিষ্ঠান গড়ে দখল অব্যাহত রেখেছে। ফলে নদী সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি দূষণের কবলে পড়ে বিপন্ন হতে চলেছে। দখলদারদের উচ্ছেদে বিআইডব্লিউটিএ, জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর বারবার উদ্যোগ নিলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
বিআইডব্লিটিএ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬০ সালে বরিশাল নদীবন্দর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কীর্তনখোলা নদীর পানির স্তর থেকে স্থলভাগের দিকে জমির ৫০ ফুট পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএর আওতায় থাকার কথা। সে অনুযায়ী নৌ-বন্দরের উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৩৭ একর জমি বিআইডব্লিউটিএর। সীমানা চূড়ান্তকরণ বা পুনঃনির্ধারণের আগে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ৮ একর বিভিন্ন সময়ে ৩০৬ জন মিলে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে।
বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক ও বরিশাল বন্দর কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ২০১৯ সালের মার্চ মাসে তত্কালীন বরিশাল জেলা প্রশাসক জেলার বিভিন্ন নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের নিমিত্তে যৌথ জরিপ করে সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করেন। করোনার প্রভাব ও দক্ষ জনবল সংকট থাকায় কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।
বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার জানান, বরিশালের নদী ও খাল রক্ষায় জেলা প্রশাসন সতর্ক ও সজাগ রয়েছে। গত সপ্তাহে কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী ৬০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিছু কিছু স্থানে আদালতে মামলাসহ আইনি জটিলতা রয়েছে। তা কাটিয়ে উঠে নদী ও খাল রক্ষায় অভিযান পরিচালিত হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে যে ফোরশোর (নদীর লো ওয়াটার এবং হাই ওয়াটার লেভেলের মধ্য থেকে ৫০ ফুট নদীর পার পর্যন্ত) রয়েছে তার শতকরা ৩০ ভাগও বিআইডব্লিউটিএর নিয়ন্ত্রণে নেই। এই ফোরশোর ভূমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে-বেনামে বিভিন্ন মহল থেকে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভোগদখল করে আছে। যা বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এছাড়া অবৈধ দখলদাররা নদীকে দূষণসহ দখল কার্যক্রম আরো এগিয়ে যাচ্ছে। এসব ভূমিদস্যুরা অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বিভিন্ন কারখানা তৈরি করে তার বর্জ্য ফেলে কীর্তনখোলা নদীর পানি দূষিত করছে। নগরীর অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ওষুধ কারখানা, প্লাস্টিক কারখানার বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে চলে যায় কীর্তনখোলা নদীতে। নদীতীরে গড়ে ওঠা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, তেল ডিপো, মত্স্য ও কাঁচাবাজারের বর্জ্য কীর্তনখোলার পানি দূষিত করে ফেলছে। ঢাকা-বরিশাল রুটসহ অভ্যন্তরীণ রুটের লঞ্চগুলো বরিশাল নৌ-বন্দরে নোঙর করে ধোয়ামোছা থেকে শুরু করে লঞ্চের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন কীর্তনখোলা নদীতে। ফলে পানির সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নৌবন্দর এলাকার।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম জানান, নদীর জীবন্ত স্বত্বা নিশ্চিতকরণে বরিশালের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষ্যে রবিবার কীর্তনখোলার তীরে রিভার ডায়ালগ কর্মসূচি পালন করবে। তাদের দাবি, কীর্তনখোলা নদীর আদি রূপরেখা তথা সিএস মৌজা ম্যাপ অনুসরণ করে এর প্রকৃত সীমানা অতি দ্রুত নির্ধারণ, স্থায়ী পিলার স্থাপন।
