॥ উনিশ ॥
দরিরামপুর স্কুলজীবন
ঠিকমতো পৌঁছাল দুখু। সাখাওয়াতউল্লাহ্ই গ্রহণ করলেন তাকে। কাজী সাহেবদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে মোটেও ভীত হলো না সে। এ বাড়িতেই জায়গিরের ব্যবস্থা হলো। কিছুদিনের মধ্যেই সে মানিয়ে নিল জায়গির-জীবন। বাড়ির কয়েকটি ছোটো শিশুকে পড়াতে হবে। এটাই কাজ। বিনিময়ে থাকা-খাওয়া। মন্দ না। বাড়ির সামনে পুকুরপাড়ে কাছারিঘরে থাকার জায়গা হলো তার।
দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তির চেষ্টা চলছে দুখুর।
কিছুতেই ভর্তি করানো যাচ্ছিল না দুখুকে। স্কুলের এক পরিচিতজনের মাধ্যমে ভর্তির চেষ্টা চলছে। ব্যর্থ হলেন তিনি। তখন নজরুল তাঁকে একটা চিঠি লিখল। ভর্তি হতে না পারলে চুরুলিয়ায় চলে যাবে বলে ইঙ্গিত দিয়ে লেখা চিঠিটা ওই ব্যক্তির হাতে পৌঁছে দিলো। তদবিরকারী সেই চিঠি তুলে দিলেন প্রধান শিক্ষকের হাতে। চিঠিটি পড়ে, তার ভাষা, রচনাকৌশল ও উন্নত ভাব প্রকাশের ক্ষমতা দেখে বললেন, এখনই নিয়ে এসো ওই ছোকরাকে।
ডাক পেয়ে হাজির হলো দুখু।
প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘তোমার চিঠির বিনিময়ে শাস্তি বরাদ্দ করা হয়েছে। কী শাস্তি পেতে চাও, বলো?’
দুখু মাথা নত করে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বলল, ‘কোনো অন্যায় করিনি আমি। শাস্তি আমার প্রাপ্য নয়। অন্যায় না করে শাস্তি কেন পাব?’
উল্লসিত হয়ে শিক্ষক বললেন, ‘গুড, ভেরি গুড। উত্তর শুনে খুশি হয়েছি। তোমার বরাদ্দ শাস্তি হলো এ স্কুলে অ্যাডমিশন।’
দুরন্ত উদ্বেগের ঘোড়া আচমকা থেমে গেল। হঠাৎ টের পেল বুকের মধ্যে এমন টগবগ করে লাফাচ্ছে এক হরিণ, সোনার হরিণ। হরিণের লম্ফঝম্প কি সামাল দেওয়ার শক্তি আছে নিজের? জানে না সে। স্থির দাঁড়িয়ে রইল প্রধান শিক্ষকের সামনে।
শিক্ষক এক পা এগিয়ে এসে হাত রাখলেন দুখুর মাথায়। কৌতুকরসে টইটম্বুর হয়ে আবার বললেন, ‘আরেকটা শাস্তিও বরাদ্দ করে ফেলেছি তোমার জন্য।’
জবাব না দিয়ে, সাড়া না দিয়ে আবারও সে চেয়ে রইল মাটির দিকে।
‘তোমার পড়াশোনার কোনো খরচ লাগবে না। ফ্রি স্টুডেন্টশিপ বরাদ্দ হলো তোমার জন্য।’
বুকের ভেতর হরিণটা আবারও দাপিয়ে উঠল। ছুটতে শুরু করল। এই ছোটা হবে প্রতিদিন পাঁচ মাইলের―কাজীর শিমলা গ্রাম থেকে দরিরামপুর স্কুলে।
সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্র প্রতিদিন পাঁচ মাইল পথ হেঁটে যাওয়া-আসা শুরু করল স্কুলে। পড়াশোনার প্রতি তার গভীর টানের কাছে এ দূরত্ব তুচ্ছ হয়ে গেল। দুখুর জীবন বলে কথা! সবকিছু কি আর ঠিকঠাকমতো চলে? কাজীর শিমলার জায়গির-বাড়িতেও কী যে হলো! মন আর টেকে না। হাঁটার শ্রম তো আছেই, আরও আছে বাড়ির শিশুদের পড়াশোনার বাড়তি দায়িত্ব। পড়াশোনায় অনাগ্রহী দুষ্টু শিশুদের পড়ানো চাট্টিখানি কথা নয়। কিছুতেই তাদের বাগে আনতে পারছিল না দুখু। ফলে কীভাবে সময় চলে যায়, কখন সূর্য ওঠে, কখন ডোবে, কখন স্কুলে থাকে, কখন বাসায়―হিসাব মেলাতে পারছিল না সে। শ্রম আর সময়ের চাপে নিজের মধ্যে ডুব দেওয়ার অবসর না পেয়ে কাজীর শিমলার জায়গির-বাড়ির প্রতি বিতৃষ্ণা বাড়তে লাগল।
স্নেহের কাঙাল দুখুর কি মমতারও ঘাটতি হচ্ছে এ বাড়িতে? মুখ দেখলে বুঝা যায়, মুখ ফুটে কাউকে সে না বললেও, স্পষ্ট মমতার ক্ষুধার কাছেও পরাজয় বরণ করছে দুখু। এ বাড়ির কেউ কি অবহেলা করছে? খারাপ ব্যবহার করছে? তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে তাকে? নাকি দুখুর মমতার তৃষ্ণা বেশি প্রকট বলে চাহিদা পূর্ণ হচ্ছে না? তা-ও বুঝা যাচ্ছে না ওকে দেখে।
স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে আজ। এখনো সকালের খাওয়া আসেনি জায়গির-ঘরে। হাঁসফাঁস করছে দুখু। দেরি হলে ক্লাস মিস করবে। উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা আর শেষ হয় না। শেষ পর্যন্ত খাওয়া এলো না। না-খেয়েই হন্তদন্ত হয়ে বই বগলদাবা করে সে হাঁটতে লাগল স্কুলের দিকে। গ্রামীণ পথ, আইল পথ, পুকুরপাড় আর কখনো-বা কারো বাড়ির ভেতর দিয়ে ছুটতে হয়। কাঠকয়লার খনির পোড়া ঠনঠনে রাস্তায় হাঁটায় অভ্যস্ত আর সবুজ গাছগাছালিঘেরা মেঠোপথ ধরে হাঁটতে-চলতে অনভ্যস্ত দুখু কিছুদিনের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিলেও, আজ হাঁটতে গিয়ে খিদেয় পেট চিনচিন করে উঠল। তবুও ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। সামনে সে দেখল কয়েকজন কিশোর তার চেয়ে বড়ো, খালে জাল পেতে মাছ ধরছে।
একজন, দুখুকে চেনে, সামনে এসে বলল, ‘এই বাঁশিওয়ালা, স্কুল যাওন বাদ দে, আমাগো লগে আয়, মাছ ধরবাম, মজা কুড়াইবাম। আয়।’
‘সামনে থেকে সরো, সময় নেই হাতে, স্কুলের সময় পার হয়ে যাবে দেরি হলে। আরও অনেক দূর পথ যেতে হবে আমাকে। সরো।’
দুখুর তাড়া আর কড়া কথায় খেপে উঠল ছেলেটি। আরও কয়েকজনের নজর কেড়ে বলল, ‘হে আমারে ধমকায়। স্কুলের দেমাগ দেহায়।’
‘কী? তোরে ধমকায়?’ বলতে বলতে ছুটে এলো একজন। পেছন থেকে খুব জোরে ধাক্কা দিলো দুখুকে। অপ্রস্তুত দুখু অনেকটা উড়ে গিয়ে পড়ে গেল খালে।
মস্তিষ্ক থেকে ঝোড়োগতিতে সংকেত পৌঁছে গেল হাতে। ধাক্কা খেয়ে গলাসমান খালের পানিতে পড়ে গেলেও, হাত উঁচু করে বুকের ধন বইখাতা রক্ষা করতে পারল সে। চোখ উঠে গেল দুহাতের দিকে। বই ভেজেনি, খাতা ভেজেনি; বুকের ধনকে রক্ষা করতে পেরে বিপদের মধ্যেও কেঁদে ফেলল আনন্দে। একটি খাতার মধ্যে লেখা আছে তার অনেকগুলো পদ্য! কিছুতেই এই পদ্যগুলোর ক্ষতি হতে দেবে না সে। দিতে পারে না। এসব কথা ভাবতে গিয়ে আবার তাকাল বিশাল আকাশের দিকে। আকাশের পুব দিগন্ত বেয়ে সূর্য উঠে যাচ্ছে উপরে। নরম নরম রোদে ডুবে যাচ্ছে পুরো প্রকৃতি, গাছগাছালি। দুখুর মনপ্রকৃতিও ছুঁয়ে নিল কাঁচাসোনা রোদের পরশ। বালকদের ওপর ক্ষোভ আর ক্রোধ দেখানোর কোনো তাড়না এলো না, বরং গলাসমান পানিতে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলতে লাগল―আজ স্কুলে যেতে পারলাম না ঠিকই। তবে তোমরা আমাকে পরাজিত করতে পারোনি। হাতের মুঠোয় আমি ধরে রেখেছি আমার জয়।
হইহই করে উল্লাস করছে গ্রাম্য কিশোরদল। সেই উল্লাসে কান দিলো না দুখু। সামনে তাকিয়ে দেখল লম্বা ঠ্যাংওয়ালা কয়েকটি সাদা বক কাদাপানিতে দাঁড়িয়ে নিবিড় চোখে তাকিয়ে আছে জলের দিকে। শিকারের আশায় চেয়ে থাকা তাদের চোখের নিবিড় চাউনি রাঙিয়ে দিলো দুখুর মন। সে-ও আবার তাকাল উদিত সূর্যের দিকে। আলোর অভিমুখে ছুটতে হবে তাকে। ওটাই তার আসল গন্তব্য। ভাবতে ভাবতে কাদামাটি মেখে উঠে এলো সে খালের পানি থেকে।
॥ বিশ ॥
উদাস বাউলের বুকের কান্না
নদীমাতৃক এই সবুজ বাংলায় কি ভালো লাগছে না দুখুর? এমন উদাস হয়ে কী ভাবে সে? জন্মভূমির কঠিন শিলার সুষমা কি টানছে তাকে? এমন চিন্তা জাগল সহপাঠী নিয়ামতের মনে। দূর থেকে সে দুখুকে দেখে কাছে আসে। তারপর তার পাশে বসে হাত রাখল দুখুর পিঠে।
কারো হাতের স্পর্শে হঠাৎ করেই যেন সে জেগে উঠল কোনো স্বপ্ন থেকে।
‘কী ভাবছ, দুখু?’
উত্তর দিতে পারল না সে। এ অঞ্চলে দূরের কথা, স্কুলেও ভালো কোনো বন্ধু এখনো পায়নি দুখু। হঠাৎ এমন জিজ্ঞাসায় বন্ধুত্বের অতৃপ্ত তৃষ্ণায় জলের ছিটা খেয়ে অবাক তাকিয়ে থাকল।
‘মন খারাপ, দুখু?’
আবারও প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। শূন্য মন ‘ভালো’ না ‘খারাপ’ বুঝে উঠতে পারল না। আপন বলয়ের শূন্যবৃত্তে কয়েক চক্কর ঘুরপাক খেয়ে কিছুটা নড়ে উঠে দুখু জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি এ পাড়ায় থাকো?’
‘হ্যাঁ। ওই তো, ওই যে, এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, বড়ো আর উঁচু খড়ের গাদা, ওটাই আমাদের বাড়িতে ঢোকার পথ। যাবে আমাদের বাড়ি? এখন তো শীতকাল। খেজুরের রসের শিরনি খাওয়াব, যাবে?’
জিভে কি পানি চলে এলো? এমন ভিজে গেল কেন গলা? না-বুঝে দুখু বলল, ‘যাব একদিন। তার আগে বলো, তোমাদের এ পাড়ায় কোনো জায়গিরের ব্যবস্থা হবে? কাজীর শিমলা গ্রাম থেকে রোজ হেঁটে এসে স্কুলের পর আবার হেঁটে বাড়ি ফিরে শরীরে আর শক্তি পাই না। গিয়েই আবার পড়াতে হয় খুদে ছাত্রছাত্রীদের। পড়ানোর চাপও কম না। সব মিলিয়ে কষ্টে আছি। একটু উপকার করতে পারবে, এখানে জায়গির ঠিক করে দিয়ে?’
নিয়ামত বলল, ‘দেখব আমি। কাল জানাব তোমাকে।’
স্কুলের কাছাকাছি বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে জায়গির হয়ে গেল দুখুর।
স্কুলে যাওয়া-আসার পথশ্রম থেকে বেঁচে গেলেও, বাঁচার লড়াই থামল না। এক আশ্রয় থেকে আরেক আশ্রয়ে আসা, আশ্রিতের প্রতি অনাদর না অবহেলা, অন্যের গলগ্রহ হওয়ার যাতনা না অন্য কিছুর যাতনায় দুঃখময় থাকে দুখুর দিনযাপন, বুঝা যায় না। নাকি কাজীর শিমলা গ্রামের জায়গিরদাতা সাখাওয়াতউল্লাহ্র বাড়ির কোনো ছাত্রীর কথা মনে করে মন খারাপ থাকে, তার আলামতও নেই দুখুর প্রকাশ্য আচরণে। ওই জায়গির বাড়িতে সবুর আখন্দের মেয়ে নূরজাহানকে উর্দু তালিম দেওয়ার কল্পনা কি বাস্তবের কোনো কিশোরীর প্রতিচ্ছবি ভাসিয়ে তোলে চোখের সামনে, তা-ও বুঝে উঠতে পারে না দুখু। এ অঞ্চলের খেলার সাথি দুরন্ত রাখাল বালকদের সঙ্গে ছুটির দিনে কখনো কখনো খেলতে গেলেও, খেলার সময় প্রাণমাতানো আনন্দের জোয়ার আসে না মনের পুকুরে। বরং প্রিয় বাঁশিটি সঙ্গে নিয়ে একাকী সে চলে যায় স্কুলের কাছের ঠুনিভাঙা ঝিলের তীরে। বিস্তীর্ণ ঝিলের টলমল পানি, ডুবন্ত শাপলাপাতা, ফুটে থাকা শাপলা ফুল, পাতার উপর দিয়ে ছুটোছুটি করতে থাকা পোকামাকড় চিকন সুতোর মতো রেখা টেনে যে অসাধারণ শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তোলে, তা দেখে মন ভরে যায় দুখুর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে ঝিলপাড়ে। বাঁশিতে সুর তোলে। সুরের টানে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে শীতের পাখির ঝাঁক। পুঁটি আর টাকিমাছ ছুটোছুটি করে জলে। কখনো শোল-গজার ছুটে এসে গিলে খায় পুঁটি কিংবা পোনামাছ। কখনো কখনো কোলাব্যাঙ লাফ দিয়ে উঠে পাড়ে, সাপ এসে কামড়ে ধরে ব্যাঙের ছাও, ঠ্যাং উঁচিয়ে ঝিলের পাড়ের গাছ বেয়ে উঠে যায় প্যাঁচার দল। দুখু দেখে আর বাঁশি বাজায় আপনমনে। বাঁশিতে সুর তুলে ঢেলে দেয় যত দুঃখকষ্ট, আর উদাস হয়ে খেলতে থাকে বাউল সুরের খেলা।
সময় কতক্ষণ গেছে, টের পেল না দুখু। সূর্য ডুবে যাচ্ছে পশ্চিম দিগন্তে। মনে হচ্ছে, ঝিল টেনে নিচ্ছে সূর্যের ম্লান হওয়া লাল রং। হালকা আঁধার ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। দ্রুত উঠে দাঁড়ায় দুখু। হাঁটতে লাগল বাড়ির দিকে।
চলবে...
