মরুভূমি যতটা না অদ্ভুত তার থেকে অদ্ভুত মরু অঞ্চলের উদ্ভিদ। মরুউদ্ভিদ আমাদের আশেপাশের গাছ থেকে ভিন্ন। এসব উদ্ভিদ মরুভূমির তীব্র গরম সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। পাতার বদলে এদের থাকে অসংখ্য কাঁটা। মরুভূমি মানেই পানির তীব্র সংকট। ফলে ভবিষ্যতের জন্য পানি জমিয়ে রাখতে এদের দৈহিক গঠন একটু ভিন্ন হয়। এসব উদ্ভিদের মূল মাটির অনেক নিচে থাকে এবং পানির জন্য কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত মাটির গভীরে যেতে পারে। কিছু মরুউদ্ভিদ নিয়ে বলা যাক—
সিলভার টর্চ ক্যাকটাস: আর্জেন্টিনা আর বলিভিয়ার উঁচু পর্বতাঞ্চলীয় মরুভূমিতে জন্মে। ক্যাকটাসিয়া গোত্রের বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। দেহাবয়ব অসংখ্য উলের মতো সূক্ষ্ম তন্তুসমৃদ্ধ বলে একে ‘উলি টর্চ’ ক্যাকটাসও বলা হয়। এর সরু, খাড়া, সবুজাভ ধূসর কাণ্ড ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হলেও সেগুলোর ব্যাস সর্বোচ্চ ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এটি প্রচুর সূর্যালোক পছন্দ করলেও বেশি তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে না। বলিভিয়ান মরুভূমিগুলোর এমন সব স্থানেই এ গাছ জন্মায়, যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকলেও তাপমাত্রা অত বেশি নয়, আবার গ্রীষ্মকালে প্রচুর বৃষ্টিও হয়। পর্যাপ্ত পানি আছে, এমন অঞ্চলে জন্মায় বলে এদের দেহে অন্যান্য মরু উদ্ভিদের মতো পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা বিবর্তিত হয়নি। বেশি তাপমাত্রা সইতে না পারলেও, শূন্যের ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারে!
জাম্পিং কোলা: ‘টেডি বিয়ার কোলা’ নামেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিগুলোতে অহরহই দেখা যায়। একে সহজেই চেনা যায় এর দেহের গঠন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখে। প্রধান কাণ্ড থেকে অসংখ্য ছোট-বড় শাখা কাণ্ড বের হয়—যেগুলো অত্যন্ত ঘন, তীক্ষ কাঁটায় পরিপূর্ণ। এত বেশি কাঁটার কারণে এর দেহকাণ্ড দেখতে মোলায়েম মনে হয়। প্রতিরক্ষার পাশাপাশি কাঁটাগুলোর জরুরি কাজ হলো পানি সংগ্রহ। এমনকি পাতা বিহীন এ উদ্ভিদের পাতার কাজও করে এই কণ্টকগুলোই। মে মাসে এই গাছে ফুল ধরে।
বাওবাব গাছ: আফ্রিকা, আরব আর অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিগুলোতে জন্মায় এই অদ্ভুত গাছগুলো, সবচেয়ে বেশি পানিও ধারণ করতে পারে। বাওবাব পৃথিবীর প্রাচীনতম ‘অ্যাঞ্জিওস্পার্ম’ উদ্ভিদের একটি। দীর্ঘায়ু হয়ে থাকে, এক হাজার বছরের মতো বেঁচে থাকে সহজেই।
উলেমি পাইন: একে বলা হয় ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’। পৃথিবীর বিরলতম উদ্ভিদগুলোর একটি, যা কেবল অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিগুলোতেই জন্মায়। জিমনোস্পার্ম গোত্রের একটি উদ্ভিদ, যার যে অল্প কয়েকটি সদস্য আজ অবধি টিকে আছে, উলেমি পাইন তাদের অন্যতম। এর আছে প্রতিকূল তাপমাত্রায় বেঁচে থাকার এক অসীম ক্ষমতা। এর কোনো পাতা নেই, আছে পাতা সদৃশ একরকম কাণ্ড। কাণ্ডগুলো পানি জমা করে প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য। প্রতিটি উদ্ভিদেই পুরুষ এবং নারী শঙ্কু থাকে।
ডেজার্ট আয়রনউড: বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ। দেখতে অনেকটা মটর গাছের মতো মনে হয়। গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ হলেও এর দেহাবয়ব বৃক্ষের মতো। উত্তর আমেরিকার সনোরান মরুভূমিতে জন্মে। এটি অত্যন্ত ধীরগতিতে বড় হয় এবং ১০০-২০০ বছরে মাত্র ২৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে আর বাড়ে না। এর নীল এবং ধূসর রঙের পাতাগুলো একে দেখতে আকর্ষণীয় করে তোলে। মরুভূমিতে পথভ্রষ্ট পথচারীর জন্য প্রবল স্বস্তি বয়ে আনে। কেননা প্রাপ্তবয়স্ক ডেজার্ট আয়রনউডের নিকটবর্তী তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো হ্রাস করতে সক্ষম! প্রচণ্ড গরমে যখন পানির সংকট দেখা দেয়, তখন এই উদ্ভিদের অধিকাংশ পাতা ঝরিয়ে ফেলে। পরের মৌসুমে পানি পেলে আবার নতুন পাতার সৃষ্টি হয়। এই উদ্ভিদ সর্বোচ্চ ১,৫০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
সাগুয়ারো ক্যাকটাস: ক্যাকটাস উদ্ভিদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা। দেখতেও কখনো কখনো বৃক্ষের মতো লাগে। মূল দেহকাণ্ড থেকে অনেকসময় কোনো শাখা-প্রশাখা সৃষ্টিই হয় না। ফলে একে দেখতে একটি বড়সড় খুঁটির মতো মনে হয়। আবার যেগুলোর গায়ে শাখা জন্মায়, সেগুলোও জন্মাতে ৭০-১০০ বছর সময় নেয়। এই উদ্ভিদগুলো সর্বোচ্চ ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আমেরিকার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে এটি জন্মায়। এর মোটা, পুরু কাণ্ড যখনই বৃষ্টি হয়, তখনই প্রচুর পানি শোষণ করে নেয়। একেকটি ক্যাকটাস যত লম্বা হয়, তাদের মূল মাটির তত গভীরে প্রবেশ করে। সাগুয়ারো একটি অ্যাঞ্জিওস্পার্ম উদ্ভিদ। মে-জুন মাসে এর ফুল ফোটে। সাগুয়ারো ফুল অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের রাষ্ট্রীয় ফুল। বন্য প্রাণীর আক্রমণ কিংবা পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়া ছাড়া এই উদ্ভিদগুলো মোটামুটি ২০০ বছরের মতো বেঁচে থাকতে পারে।
তানভীর তানিম
