সওজে ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি

কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৩৬

মুষ্টিমেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যাতে একতরফাভাবে সব কাজ না পায়, সেই লক্ষ্যে ঠিকাদারের যোগ্যতা বিবেচনায় ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি চালু করেছিল সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। পুরোনো লাইসেন্সধারী ঠিকাদারদের পাশাপাশি নতুনেরাও যেন কাজ পেতে পারে, সেই সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যেই এই পদ্ধতিতে যায় সওজ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি নিয়েও এখন কথা উঠছে। ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির কারণে এক প্রকল্পের প্রায় সব কাজই চলে যাচ্ছে এক জনের হাতে। তিনি আবার নিজে কাজ না করে সেটি বেশি মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন তৃতীয় পক্ষের কাছে। বেশি টাকায় কাজ নেওয়ায় কাজের মান ঠিক রাখতে পারছে না তৃতীয় পক্ষ। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গঠিত এক উপ-কমিটিও কয়েক দিন আগে এক প্রতিবেদনে ওটিএম (ওপেন টেন্ডার মেথড) ও এলটিএম (লোকাল টেন্ডার মেথড)-এর পক্ষে মত দিয়েছে।

সওজে দীর্ঘদিন যাবত্ ঠিকাদারির সঙ্গে সম্পৃক্তরা জানান, ম্যাট্রিক্স পদ্ধতিটা সঠিক ছিল, কিন্তু এর অপব্যবহার করা হচ্ছে। কতিপয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির অপব্যহারের কারণে সিংহভাগ কাজ পেয়ে যাচ্ছে মুষ্টিমেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ম্যাট্রিক্স পদ্ধতিকে কার্যত ‘প্যাড কোটেশন’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। সংখ্যার ভিত্তিতে কার্যত সওজের ৯০ শতাংশ কাজ পাচ্ছে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান। কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে সংখ্যা বাড়িয়ে এই চার প্রতিষ্ঠান সারা দেশে সওজের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। কাজ নিয়ে তারা ৫ শতাংশ কমিশনে তৃতীয় পক্ষের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছে। ফলে পেশাদার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চারটি প্রতিষ্ঠানের যখন আর কাজের চাহিদা থাকে না কিংবা তাদের বিট ক্যাপাসিটি থাকে না, কেবল তখনই ১০ শতাংশের মতো কাজ পাচ্ছে প্রকৃত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

সওজের প্রতিষ্ঠিত ও পেশাদার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, প্রকৃত কাজের সংখ্যার ভিত্তিতে কেউ কাজ পেলে সেখানে কারো আপত্তি থাকে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্যাড কোটেশনের মাধ্যমে গ্রুপে গ্রুপে ২০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার কাজও চলে যাচ্ছে চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। এতে কাজের মান সঠিক রাখার সুযোগ কম। তাদের মতে, প্যাড কোটেশন কোনো দরপত্র নয়, এটা পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয় না। এক্ষেত্রে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ও থাকে না। অথচ গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)সহ অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠান এলটিএম (লোকাল টেন্ডার মেথড) পদ্ধতি ব্যবহার করে। এতে শুধু লাইসেন্স থাকা ঠিকাদারেরা অংশ নিতে পারেন।

এ বিষয়ে সওজের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুস সবুর ইত্তেফাককে বলেন, ‘হার-পাঁচ বছর ধরে ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি চলছে। আইন অনুযায়ীই এটা হচ্ছে। সবাই তো আর সব জায়গায় কাজ পাবে না।’ তিনি জানান, সংশোধিত শর্ত অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো উন্নয়নকাজের একটি প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ৩৫ কোটি টাকার বেশি হলে সেক্ষেত্রে আর ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি থাকছে না। আর রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ক্ষেত্রে ১৫ কোটি টাকার বেশি হলে উন্মুক্ত দরপত্রে যাওয়া হচ্ছে।

ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের পিএমপি (পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রাম) প্রকল্পে ক্ষুদ্র সড়ক মেরামতকাজে সম্প্রতি ১২টি গ্রুপে প্রায় ৬ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর সব কটিই পেয়েছেন একজন ঠিকাদার। একই ঠিকাদার খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় একই প্রকল্পের প্রায় ১০০ গ্রুপ কাজের অধিকাংশই পেয়েছেন। কাজ না পাওয়া অন্য পাঁচজন ঠিকাদারের অভিযোগ, ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির কারণে এক প্রকল্পের সব কাজ একজনের হাতে চলে যাচ্ছে।

সওজের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি ব্যবহার করে সওজ ঠিকাদারের যোগ্যতা বিচার করে। এই পদ্ধতিতে আগের কাজের অভিজ্ঞতা, সর্বোচ্চ কত টাকায় কাজ করেছেন এবং কত বেশি কাজ চলমান আছে, তা বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে যিনি এসব যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে পারেন, তিনিই কাজ পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে অন্য ঠিকাদারদের কাজ পাওয়ার সুযোগ কম।