২০১৬ সালের মার্চ মাসে ট্রেনে সপরিবারে রামেশ্বরম থেকে মাদুরাই আসছি। ট্রেনে এক তরুণ জানায়, গান্ধীজি তিন বার মাদুরাইতে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি জগদ্বিখ্যাত মীনাক্ষী মন্দিরে প্রবেশ করেননি। বিষয়টা অবাক করার মতো। কারণ এ মন্দিরের অনেক বিশেষত্ব রয়েছে। কিংবদন্তি আছে যে এ মন্দিরের শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র। মন্দিরের সরোবর পরিদর্শন করেন দেবরাজ ইন্দ্র। অতীতে এ সরোবরের জলে সাহিত্যমূল্য বিচার করা হতো। যেমন, মূল্যহীন সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি জলে রাখলে ভারী পাথরের মতো ডুবে যেত। যার সাহিত্যমূল্য আছে তা ভেসে থাকত এবং স্বীকৃতি পেত। গান্ধীর মতো একজন মহান মানুষ সে মন্দিরে প্রবেশ করছেন না দেখে মন্দির পরিচালনা কমিটির লোকজন গান্ধীজির শরণাপন্ন হন। গান্ধীজি শর্ত জুড়ে দেন, অন্ত্যজ ও অস্পৃশ্যদের মীনাক্ষী মন্দিরে প্রবেশ করার অনুমতি দিলে তিনি মন্দিরে যাবেন। মন্দির পরিচালনা পর্ষদ অন্ত্যজ ও অস্পৃশ্যদের মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দেন। এরপর গান্ধীজি মীনাক্ষী মন্দিরে প্রবেশ করেন।
গান্ধীজি দলিত ও অস্পৃশ্যদের সঙ্গে যে একাত্ম হয়ে ছিলেন তা নানাভাবে প্রমাণিত। তার মধ্যে একটি চমকপ্রদ কাহিনি রয়েছে। ১৯৪৬ সালের ১৫ মার্চ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি হাউজ অব কমন্সে জানান, আমরা ভারত ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ মার্চ স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস, লর্ড পেথিক লরেন্স, এ ভি আলেকজান্ডার—এই তিন সদস্যবিশিষ্ট ক্যাবিনেট মিশন দিল্লিতে আসেন। ভারতে রাজনৈতিক দফারফা করতে হলে আগে গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করতে হবে। এটা তারা ভালোভাবে জানেন। কিন্তু তারা গান্ধীজিকে পাবেন কোথায়? তিনি তো অবস্থান করছেন ঝাড়ুদারদের বাল্মীকি কলোনিতে। নিরুপায় হয়ে স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস ও লর্ড পেথিক লরেন্স সরকারি আদব-কায়দা উপেক্ষা করে বাল্মীকি কলোনিতে গিয়ে গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করেন। গান্ধীজির প্রার্থনা সভাগুলোতে তারা যোগ দেন। এজন্য এ দুজনের ওপর ভাইসরয় জেনারেল ওয়াভেল বিরক্ত হয়েছিলেন।
হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় অন্ত্যজ-অস্পৃশ্য ও দলিত শব্দের অর্থ হলো ভগ্ন বা ছিন্নভিন্ন। এদের বেশির ভাগই হিন্দুধর্মাবলম্বী। এছাড়া তারা বৌদ্ধ, শিখ, খ্রিষ্ট এবং বিভিন্ন লোকধর্মসহ নানান ধর্মে বিশ্বাস করে। ভারতে তাদের সংখ্যা ১৬ থেকে ২০ কোটি। পুনে প্যাক্টের পর ১৯৩৩ সালে গান্ধীজি সমাজের দলিত বা অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত লোকদের হরিজন নামে নামকরণ করেন। হরিজন অর্থ হচ্ছে হরি বা ভগবানের লোক।
১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকার অস্পৃশ্য হিন্দুদের জন্য সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় অস্পৃশ্য হিন্দুদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়। এ সময় তখন অস্পৃশ্য হিন্দুদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনের দাবিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। গান্ধীজি সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের বিরোধিতা করলেন। তার মতে, হিন্দুুসমাজকে বর্ণহিন্দু ও তপশিলভুক্ত হিন্দু—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, স্বতন্ত্র নির্বাচন মানে হলো, অস্পৃশ্যদের হিন্দুসমাজ থেকে পৃথক করে দেওয়া। এটা তিনি চাননি। অস্পৃশ্যরা বিশাল মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে একত্রিত হয়ে বসবাস করবে। অস্পৃশ্যতার নাগপাশ থেকে তারা মুক্ত হয়ে সর্বমানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে। এটাই তিনি কামনা করেছেন।
গান্ধীজি সংকল্প করলেন তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের বিরুদ্ধে আমরণ অনশন করবেন। অনশনের এক দিন আগে ১৯ সেপ্টেম্বর তার সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক তারবার্তা প্রেরণ করেন। গান্ধীজি পাঁচ দিন একাধারে অনশন করায় সারা দেশবাসীর সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথকে উত্কণ্ঠিত করেছিল। গান্ধীজির পাশে থাকবেন বলে ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি পুনার পথে রওনা দিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন তার সেক্রেটারি কবি অমীয় চক্রবর্তী এবং সুরেন্দ্রনাথ কর। কবি ২৬ সেপ্টেম্বর পুনার যারবেদায় পৌঁছেন। তার আগের দিন অনশনের ষষ্ঠ দিবসে বর্ণহিন্দু ও অনুন্নত জাতির নেতাদের মধ্যে এক আপসমূলক চুক্তি হয়। যা ইতিহাসে ‘পুনা প্যাক্ট’ বলে পরিচিত। গান্ধীজির স্ত্রী কস্তুরবার হাত থেকে কমলালেবুর রস পান করে অনশন ভঙ্গ করেন। রবীন্দ্রনাথ তার কাছে গেলে গান্ধীজির অনুরোধে তিনি গেয়েছিলেন, ‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো’।
পুনা প্যাক্ট-এর পর অনুন্নত জাতির লোকেরা গান্ধীজি কর্তৃক ‘হরিজন’ আখ্যায়িত হয়। অস্পৃশ্যদের জন্য মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছিল। গ্রামের কুয়োর জল হরিজনদের জন্য নিষিদ্ধ রইল না। সর্বোপরি জওহরলাল নেহেরুর মা স্বরূপরাণী নেহেরু জানালেন যে, তিনি হরিজন পাচকের হাতের রান্না নিয়মিত আহার করছেন। ১৯৩৩ সালের ২ অক্টোবর গান্ধীজির জন্মদিন পালিত হলো অস্পৃশ্য দিবস হিসেবে।
১৯২০ সালে ‘নবজীবন’ পত্রিকায় তিনি লিখেছেন, তিনি কোনো অবস্থাতেই অস্পৃশ্যদের ত্যাগ করবেন না। এমনকি তাদের জন্য স্বরাজ (স্বাধীনতা) ত্যাগ করতেও রাজি। আহমেদাবাদে এক প্রার্থনাসভায় বলেছিলেন, ‘আমি প্রার্থনা জানাই যদি আমার পুনর্জন্ম হয়, তাহলে আমি যেন অস্পৃশ্য হয়ে জন্মাই।’ জীবনের শেষ দিকে নিজেকে তিনি মেথর হিসেবে পরিচয় দিতেন। বলতেন, ‘ম্যায় ভাঙ্গি হুঁ’।
একজন সর্বোত্তম মানুষের পক্ষে এসব বলা এবং করা সম্ভব।
n লেখক :সাংবাদিক

