বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২১, ২১:৪৯

ঢাকার পরে চট্টগ্রাম সর্বাধিক জনবহুল শহর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা। তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণও। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের মোট বর্জ্যের শতকরা প্রায় ২১ ভাগই উত্পাদিত হয় চট্টগ্রামে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বর্জ্য নিষ্কাশনের আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। ফলে বিপুল মানুষের গৃহস্থালির বর্জ্য প্রতিদিন যত্রতত্র নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। বর্জ্য পদার্থকে এখানে সেখানে স্তূপ করে রাখা হয় এবং তা পচে-গলে চারপাশকে মারাত্মক দূষিত করে। বর্ষা মৌসুমে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ডাস্টবিন উপচে কঠিন বর্জ্য রাস্তার পাশে ড্রেনে পড়ে, পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অচল করে দেয়। বর্ষাকালে খাল যেখানে পানিতে টইটুম্বুর থাকার কথা, সেখানে পানির পরিবর্তে থাকে আবর্জনার স্তূপ! ফলে জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামে নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই শহরে বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আবর্জনার স্তূপে পাঠানোর পরিবর্তে প্রয়োজন পরিকল্পিত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

বর্তমানে বাংলাদেশে বর্জ্য সৃষ্টি হচ্ছে প্রতি বছর প্রায় ২২.৪ মিলিয়ন টন, অর্থাত্ মাথাপিছু ১৫০ কিলোগ্রাম। এ হার ক্রমাগত বাড়ছেই। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ৪৭ হাজার ৬৪ টন বর্জ্য উত্পন্ন হবে। এতে মাথাপিছু হার বেড়ে দাঁড়াবে ২২০ কিলোগ্রাম। করোনাকালীন এই দূষণের মাত্রা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডোর)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার এক মাস পর উত্পাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। এর মধ্যে চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৯ টন, যেখানে সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস এবং স্যানিটাইজারের বোতল, ত্রাণ বিতরণে ব্যবহূত প্লাস্টিক ব্যাগের বর্জ্য সৃষ্টি হয়েছে। এসব নতুন দূষকের হাত থেকে পরিবেশকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন সঠিক ও সুপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশভেদে, শহর বা গ্রামীণ এলাকাভেদে, আবাসিক বা শিল্প এলাকাভেদে আবর্জনা ব্যবস্থাপনার ধরন আলাদা। কোনো একটি এলাকার জনস্বাস্থ্য, কারিগরি এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সফল কার্যকারিতা নির্ভর করে। আঞ্চলিক পরিবেশ এবং এলাকার জনগণের প্রাত্যহিক জীবনযাপন পদ্ধতিও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করে তোলার বিকল্প নেই। সাধারণত স্থানীয় বা পৌর কর্তৃপক্ষ আবাসিক বা প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা থেকে উত্পন্ন অবিষাক্ত ময়লাসমূহের জন্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে। অপরপক্ষে বাণিজ্যিক বা শিল্প এলাকার অবিষাক্ত ময়লাগুলো ঐ ময়লা উত্পন্নকারীদেরই ব্যবস্থাপনা করতে হয়। বাংলাদেশে পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত নানাবিধ পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন, বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে। একটি প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত যেসব বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে: ১) চিকিত্সা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮; ২) বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজ ভাঙার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১; ৩) ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে সৃষ্ট বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৭ (খসড়া)।

বাংলাদেশে বর্জ্য উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল্ড পদ্ধতিতে চূড়ান্ত ডিসপোজ করা হয়। এটি মোটেও পরিবেশসম্মত নয়। শহরাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আইন, বিধিমালা ও আদেশ যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুফল পাওয়া যাবে। প্রতিটি শহর ও গ্রামের প্রতিটি অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিতকরণে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার আওতায় আনতে হবে এবং তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের কোনো বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলোতে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহারযোগ্য লাভজনক ভিন্ন বস্তুতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। এজন্য তারা অন্য দেশ থেকেও বর্জ্য আমদানি করছে। বাংলাদেশেরও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

শিক্ষার্থী, ওমরগণি এম.ই.এস কলেজ, চট্টগ্রাম