আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছাড়ল মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস। শুধু তাই নয়, আজ থেকে কোনো রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না সংগঠনটি। খেলাফত মজলিস ২০ দলীয় জোটের কোনো কর্মসূচি না থাকার পাশাপাশি ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথা উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায় দলটি।
গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলনে দলটির চেয়ারম্যান মাওলানা ইসহাক এ ঘোষণা দেন।
জোট ত্যাগের কারণ সম্পর্কে মাওলানা ইসহাক বলেন, রাজনৈতিক জোট ইস্যুকেন্দ্রিক গঠিত হয়। জোট কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। খেলাফত মজলিস ২০ দলীয় জোটে দীর্ঘ ২২ বছর যাবত্ আছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০ দলীয় জোটের দৃশ্যমান রাজনৈতিক তত্পরতা ও কর্মসূচি নেই। ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে ২০ দলীয় জোটকে কার্যত রাজনৈতিকভাবে অকার্যকরও করা হয়। এমতাবস্থায় আদর্শিক, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, ২০১৯ সালের মজলিসে শুরায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খেলাফত মজলিস গতকালের মজলিসে শুরার অধিবেশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে খেলাফত মজলিস একটি আদর্শিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে স্বকীয়-স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে ময়দানে ভূমিকা রাখবে এবং এখন থেকে ২০ দলীয় জোটসহ সব রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করছে। আরো উল্লেখ্য, সংগঠনের মহাসচিব বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক, গবেষক ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ কারারুদ্ধ জননেতা ড. আহমদ আবদুল কাদেরের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানায় খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা। একই সঙ্গে গ্রেফতারকৃত উলামায়ে কেরাম ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আশু মুক্তি দাবি করে।
লিখিত বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, খেলাফত মজলিস একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতির প্রয়োজনে সর্বদা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে খেলাফত মজলিস বিশ্বাসী। একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন হিসেবে দীর্ঘ তিন দশকেরও অধিক সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে দেশ, জাতি, ইসলাম ও জনগণের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। খেলাফত মজলিস মনে করে, দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক মতাদর্শ লালনপালন করার অধিকার আছে। যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেও স্বীকৃত। বিগত ২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মজলিসে শুরার অধিবেশনে ২০ দলীয় জোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে পরবর্তী সিদ্ধান্তের পূর্ব পর্যন্ত খেলাফত মজলিস জোটের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। সে অনুযায়ী দীর্ঘ দুই বছরের অধিক সময় ধরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
এর আগে দুপুরে খেলাফত মজলিস তাদের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করে। বৈঠকে প্রায় দুই শতাধিক সদস্য অংশ নেন।
মজলিসের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর। আর এই জোটে থাকায় রাজনৈতিক মূল্যায়নও পায়নি মজলিস। সর্বশেষ হেফাজতের নেতাকর্মীদের ধরপাকড়ের ঘটনায় দলটির মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন। তাই খেলাফত মজলিসের জোট ত্যাগ করার পেছনে রাজনৈতিক কারণই প্রধান। নেতারা জানান, রাষ্ট্রীয় চাপ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে নতুন আঙ্গিকে চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা চলছে মজলিসে। এর আগে জোটের শরিক দলের যথাযথ মূল্যায়ন না করাসহ কয়েকটি কারণ দেখিয়ে গত ১৪ জুলাই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ছেড়ে দেয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে সঙ্গে নিয়ে ‘চারদলীয় জোট’ গঠন করেছিল বিএনপি। পরে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বেরিয়ে গেলে যুক্ত হয় নাজিউর রহমান মঞ্জুর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। পরে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নতুন ১২টি দলের সংযুক্তির মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দলীয় জোটে। এর পর জোটের পরিধি বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দলে। তবে ২০ দলীয় জোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোট, এনপিপি, ন্যাপ ও এনডিপি বেরিয়ে গেলেও একই নামে এসব দলের একাংশকে জোটে রেখে দেয় বিএনপি। জোট ছেড়ে যায় আন্দালিভ রহমান পার্থের বিজেপিও। সর্বশেষ জমিয়ত বেরিয়ে গেলেও একই নামে আরেকটি অংশ রয়েছে জোটে।
উল্লেখ্য যে, জোটের আরেক শরিক কল্যাণ পার্টিও ২০ দল ছেড়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিএনপিকে।
