একদিন সফিপুর থেকে ফিরছি। কাজী বাড়ির বহির্বাটির পথ ধরে। হঠাত্ দাঁড়িয়ে পড়েছি। ফুলের ঘ্রাণ নাকি ফুল কোনটি থামিয়েছিল আমায়, আজ এত বছর পর সেকথা ঠিকঠাক বলতে পারছি না। আমার শরীর থেকে তখন শৈশব খসে খসে পড়ছে। হাঁসের বাচ্চার মতো পালক গজাতে শুরু করেছে। দেখি খুব কাছে ছোট ছোট সাদা গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল। এক-একটি থোকায় অগণিত ফুল, যেন সাদা রঙের খুদে মৌমাছি করেছে ভিড় সবুজ পাতাকে ছাপিয়ে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে মৃদু সুরভি। গাছটি উচ্চতায় আমার থেকে কিছুটা বড়, বয়সে আমার চেয়ে ছোট হবে বলে অনুমিত হলো। খানিক থেমে আবার হাঁটতে শুরু করেছি। বাড়ি থেকে সফিপুর যাওয়ার পথটি চেটে চেটে দেখতে দেখতে চলতাম। গাছের নবীন পাতার চোখমেলা দেখার জন্য যেমন দাঁড়িয়ে পড়তাম, তেমনি ঝরা পাতার হলুদ-লাল রঙের মাধুরীতে দিশেহারা হতাম। পথের পাশের বনের ধারের সেই গাছটি আর চোখে পড়েনি। একদিন দেখি সবুর কাকাদের ফুলের বাগানে সেই গাছটি। কিন্তু নাম জানা হয়নি। তারপর একদিন গ্রাম ছেড়েছি, শহরে এসেছি, নানারকম ফুল চিনেছি, নাম জেনেছি। কিন্তু সেই বুনোফুলটি আর চোখে পড়েনি। পড়বে কেমন করে—আমি তো তারপর বহুদিন দেখার বিলাসিতা ছেড়ে কেবল দৌড়ে পথ চলেছি রিকশায় আর বাসে।
একদিন দোয়েল চত্বরের মোড় ছাড়িয়ে বাংলা একাডেমির দিকে ঘুরে ফুটপাত ধরে হাঁটছি। পথের পাশের লোহার শিকের ওপাশে ফুলের বাগান, সাদা রঙের ছোট ছোট ফুল গুচ্ছাকারে ফুটে আছে, উপচে পড়ছে, সুরভি ছড়াচ্ছে। ছবি তুলে ফেসবুক ওয়ালে ছেপে নাম জানতে চাইলাম। এত বছর পরে আমি তার নাম জানলাম—শ্বেত রঙ্গন বা সুরভি রঙ্গন! এখন দূর থেকে ভেসে আসা এক পশলা ঘ্রাণ চেখেই আমি বলে দিতে পারব তার নাম। একদিন সেগুনবাগিচার ভেতর দিয়ে আমি রিকশায় যাচ্ছি, তখন বেলা অপরাহ। রিক্সা আরোহী আমি চকিত হলাম ফুলের ঘ্রাণে, এত পরিচিত লাগছে, একটু এগোতেই দেখি একটি পুরাতন বাড়ির বহির্অঙ্গনের একফালি ভূমিতে একটি সুরভি রঙ্গন আপন মনে গন্ধ বিলিয়ে যাচ্ছে।
সুরভি রঙ্গন গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। অনেকটা বুনো প্রকৃতির। রংবাহারি রঙ্গন যেমন রঙের দ্যুতি ছড়ায়, সুরভি রঙ্গন ঠিক তার বিপরীত। এর বিশেষত্ব তার বিনম্র সুরভি। দেখতে রঙ্গনের সঙ্গে কিছুটা মিল থাকলেও পাতা ও ফুলের গড়ন রঙ্গন থেকে আলাদা। এটি পলকা জুঁই নামেও পরিচিত। বসন্তের শেষভাগে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে বড় থোকায় ফুল ফোটে। বীজ ছাড়া শেকড় থেকেও চারা গজায়।
সুপ্তি জামান
