সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেই সকল বিদেশি টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপনসহ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়, সেইগুলি আর বাংলাদেশে দেখানো যাইবে না। ইহা ক্লিনফিড বা বিজ্ঞাপনমুক্তভাবে দেখাইতে হইবে। ক্যাবল অপারেটররা বলিতেছেন ইহা অসম্ভব। বিদেশি চ্যানেলগুলির কর্তৃপক্ষের সহিত আলোচনা করিয়াও তাহারা কোনো কূলকিনারা করিতে পারেন নাই। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার পহেলা অক্টোবর হইতে বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, ডয়চেভেলে, এনডিটিভি, এবিসিসহ প্রায় ৮৫টি বিদেশি টিভিচ্যানেল বন্ধ রহিয়াছে। পাকিস্তান আমলে আমরা আউট অব টাচে ছিলাম। ষাটের দশকে পূর্বপাকিস্তানে টেলিভিশন চালু হইলেও সমগ্র পৃথিবী আমাদের সম্মুখে তখনও ছিল অধরা। বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পর বিশেষত নব্বইয়ের দশকে আসিল ডিশ অ্যান্টিনা। একসময় ইহা গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়িল। ইহাতে বাংলাদেশি দর্শকদের সম্মুখে খুলিয়া গেল এক নূতন পৃথিবী। আমাদের নিকট পৃথিবী হইয়া উঠিল উন্মুক্ত। বিদেশি বিজ্ঞাপন প্রচার লইয়া তর্ক সেই সময়ও ছিল। তাহা ‘দেখি-দেখিব’ করিয়া কাটিয়া গেল কয়েক দশক।
ইত্যবসরে আমরা বিভিন্ন বিদেশি চ্যানেল দেখিতে দেখিতে একপ্রকার অভ্যস্ত হইয়া উঠিলাম। এই সকল চ্যানেল এতই জনপ্রিয় হইয়া উঠিল যে, ক্যাবলে ক্যাবলে ছাইয়া গেল বিভিন্ন শহরের ফুটপাত ও অলিগলি। এমনকি কোনটি বিদ্যুত্ আর কোনটি চ্যানেলের ক্যাবল তাহা নির্ণয় করা কঠিন হইয়া পড়িল। এই পরিপ্রেক্ষিতে দাবি উঠিল, ক্যাবলগুলি মাটির নিচ দিয়া নিতে হইবে। কিন্তু বিদেশী চ্যানেলগুলি বন্ধের পর আমরা আবার অন্ধকারে চলিয়া গেলাম। সমগ্র পৃথিবী হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িলাম। ইহাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া কী তাহা পথেঘাটে কান পাতিলেই শুনা যায়। বিদেশি চ্যানেল দেখিবার বিষয়টি নূতন হইলে কিছু বলিবার ছিল না। ইহাতে যে ছন্দপতন তৈরি হইয়াছে, তাহার অবসান হইবে কবে? ইহার পিছনে যতই যুক্তি প্রদর্শন করা হউক না কেন, মূলকথা হইল বিষয়টি নূতন নহে। সকল সরকারের আমলেই ইহা লইয়া আলোচনা হইয়াছে। এই সিদ্ধান্তকে কে কীভাবে নিতেছেন জানি না। তবে আমরা মনে করি, সাধারণ মানুষ ও বিশেষত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইহাতে সন্তুষ্ট নহে। বলা হয়, কাক খুবই চতুর একটি প্রাণী। মনে রাখিতে হইবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাহার চাইতেও চালাক। বলা হইতেছে বিদেশি চ্যানেলগুলি বন্ধ করা হইয়াছে; কিন্তু আসলেই কি তাহা পুরাপুরি বন্ধ হইয়াছে? বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যাপসের মাধ্যমে তাহারা তাহা ঠিকই দেখিতেছেন। তাহাছাড়া এমন একসময় এই পদক্ষেপ লওয়া হইল, যখন চতুর্দিকে সমস্যা আর সমস্যা।
আমরা জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে টেলিভিশনের আবিষ্কার হইলেও যুদ্ধের পর এই মানবিক যোগাযোগের মাধ্যমটি বিস্ময়করভাবে সম্প্রসারিত হয়। কারণ মানুষের শিক্ষা বা মনে দাগ কাটিবার ক্ষেত্রে দৃশ্যের কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে অধিক। আমাদের উপমহাদেশে ১৯৫৯ সালে দিল্লিতে প্রথম টেলিভিশনের প্রচলন হইলেও তত্কালীন পূর্বপাকিস্তান তথা ঢাকায় প্রথম টেলিভিশন চালু হয় ১৯৬৪ সালে। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময় হইতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি আমাদের মিডিয়ায়ও সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার প্রক্রিয়ায় ইহার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। উদারনীতির ফলে আমাদের সম্মুখে খুলিয়া যায় বহু জানালা। এখন ইহা শুধু একঘেয়ে ইডিয়ট বক্স নহে, আকাশ সংস্কৃতির এক বৈশ্বিক জানালা। ইহা বদলাইয়া দিয়াছে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি আর চিন্তনপ্রক্রিয়ার প্রাত্যহিকতা। সেই প্রাত্যহিকতায় এখন ছেদ পড়িয়াছে। ১৯৯২ সালের পর বাংলাদেশে বিকশিত ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজের জন্যও ইহা কোনো সুখবর নহে। এমতাবস্থায় আমরা শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া বলিতে চাই. ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না...’।
