২০২০ সালের ১০ মার্চ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হিসেবে গ্রহণের জন্য হাইকোর্টের বিচারপতি নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণার পর জাতীয় দিবসগুলোতে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদাধিকারী ও রাষ্ট্রীয় সব কর্মকর্তা সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান যাতে উচ্চারণ এবং সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাত্যহিক সমাবেশ শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ যাতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করেন সেই আদেশ প্রদান এবং তা আগামী তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই আদেশ কার্যকরের জন্য সরকারকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করতে বলেছে আদালত। হাইকোর্ট যেহেতু সংবিধান সংশোধন বা আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা রাখে না তাই আদালত বলেছে, সরকার চাইলে সংসদে আইন পাশ করে কিংবা সংবিধান সংশোধন করেও বিষয়টিকে স্থায়ী রূপ দিতে পারে।
বাংলাদেশ নামক এই জাতিরাষ্ট্রের উত্স থেকে উত্সারিত জন্মধ্বনি জয় বাংলা। বাঙালির আত্মপরিচয়জ্ঞাপক এই স্লোগান বাঙালির শৌর্য-বীর্য, সংগ্রাম-সংস্কৃতি ও জাতীয় আবেগকে খুবই তীব্র ও তাত্পর্যপূর্ণভাবে পূর্ণ মাত্রায় ধারণ করে। জয় বাংলা যেমন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি তেমনি আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সব নাগরিককে স্ব-দায়িত্ব পালনে উজ্জীবিত করার বীজমন্ত্র। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ, প্রগতি ও দেশপ্রেমে আত্মপ্রত্যয়ী করতে ‘জয় বাংলা’ শব্দ যুগল প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে যে দ্যোতনার তৈরি করে তার ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হতে হবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজের ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান ভারতবর্ষে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ভারতের সব জাতি গোষ্ঠীর দেশপ্রেমিক সচেতন জনগণ জয় হিন্দকে নিত্য ব্যবহূত অভিবাদন বাক্যে পরিণত করেছে। এর পাশাপাশি জয়ধ্বনি বা রণ হুংকার হিসেবে ৯০-এর দশকে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয় ‘জয় হিন্দ’।
পাকিস্তান আন্দোলনের সময় মুসলিম লীগ ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান তোলে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ৪৭ এর দেশভাগের অব্যবহিত পরই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে গোটা উপমহাদেশে। পাকিস্তান আর্মিতে ‘জিয়ে পাকিস্তান’ ও ভারতীয় সেনা বাহিনীতে ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়।
‘জয় বাংলা’ উপমহাদেশে সবচেয়ে প্রেরণাদায়ী, তাত্পর্যপূর্ণ স্লোগান। অথচ ভারত ও পাকিস্তানে জয় হিন্দ ও পাকিস্তান জিন্দাবাদ যে সার্বজনীনতা পেয়েছে, জয় বাংলার ক্ষেত্রে তাকে পারি দিতে হচ্ছে খুবই বন্ধুর পথ। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরেও জয় বাংলা রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহূত হচ্ছে না। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও ধর্মান্ধতা ও প্রোপাগান্ডা বাংলাদেশের প্রধানতম সমস্যা। ’৭১ ও ৭৫-এর শত্রুদের আমরা সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত করলেও জাতীয় মানসে যে ধর্মভীরুতা রয়েছে তাকে পুঁজি করেই তারা গোপনে ও ভার্চুয়ালি এখনো অতীতের মতোই ক্রিয়াশীল।
শেখ হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু কবি নজরুল ইসলামের কবিতা থেকে জয় বাংলা শব্দটি নিয়েছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাদারীপুরের স্কুল শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র দাসের মুক্তির দাবিতে নজরুল রচনা করেন ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ (১৯২২) কবিতাটি।
‘জয় বাঙলা’র পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি অন্তরীণ,
জয় যুগে যুগে আসা সেনাপতি, জয় প্রাণ অন্তহীন।’
এ সম্পর্কে আরেকটি তথ্য পাওয়া যায়, তা হলো, কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত নবযুগ পত্রিকার ৩ বৈশাখ ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ (১৯৪২) সংখ্যায় ‘বাঙালির বাঙলা’ নামে প্রকাশিত তার রচনাটি শেষ করেন এভাবে, ‘বাঙলা বাঙালির হোক। বাঙালির জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।’ তবে অধিকাংশ রাজনৈতিক গবেষকের মতামত, ছাত্রলীগই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের উদ্গাতা। ’৬৯-এর সফল গণঅভ্যুত্থানের পর বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হয়ে ২১ জন সফরসঙ্গী নিয়ে পাকিস্তান সফর করেন। ছাত্রলীগের তত্কালীন সভাপতি আব্দুর রউফ বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলেন এবং করাচীতে বাঙালি ছাত্রদের নিয়ে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনকালে তাদের জনপ্রিয় স্লোগান ‘জিয়ে সিন্ধ’ এর আদলে নতুন স্লোগান তৈরিতে উদ্দীপ্ত হন। রাজনৈতিক গবেষক বিশেষ করে সিরাজুল আলম খান দাদাভাইয়ের অনুসারীগণের মতে, ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর ক্যান্টিনে শিক্ষা দিবসের প্রস্তুতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মিসভায় আফতাব আহমাদ এই স্লোগান প্রথম উচ্চারণ করেন যা প্রথম প্রত্যুত্তর করেছিলেন চিশতি শাহ হেলালুর রহমান।
১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটি প্রথম জনসম্মুখে ধ্বনিত হয়। ঐ সভামঞ্চের ব্যাকগ্রাউন্ডে দেবদারু পাতা দিয়ে ‘জয়বাংলা’ লেখা ছিল। ১১ জানুয়ারি পল্টনের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এলে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানানো হয়। অনেকের মতে, ঐ মঞ্চেই বঙ্গবন্ধু প্রথম জয় বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করেন। তবে অধিকাংশের মত, ৭ই জুন রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রলীগ গঠিত ‘জয়বাংলা বাহিনী’ কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার দেওয়ার সময় তিনি প্রথম জয় বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করেন।
বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ সমাপ্ত করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করে। এই ভাষণের পর থেকে এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে। ১৯৭১-এর মার্চ থেকে জনসভা, মিছিলে এবং প্রচারণায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ব্যবহূত হতে থাকে। ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে মেজর জিয়াউর রহমান অস্থায়ী কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন তার শেষেও তিনি ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করা হতো। এই বেতার কেন্দ্রের স্বাক্ষরসংগীত ছিল—জয় বাংলা, বাংলার জয়।
যেহেতু সর্বোচ্চ আদালত জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল টানা ৩য় বারের মতো দেশ পরিচালনা করছে তাই লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে যেন হাইকোর্টের রায় চাপা পড়ে না থাকে। রায় বাস্তবায়নে আদালত তিন মাস সময় দিয়েছিল অথচ দেড় বছর অতিক্রান্ত। সংশ্লিষ্ট সবার দ্রুত বোধোদয় হোক। জয় বাংলা।
n লেখক : গবেষক
