জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব, সাবেক মন্ত্রী ও ডাকসুর প্রাক্তন জিএস জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু আর নেই (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল শনিবার সকাল ৯টা ১২ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি স্ত্রী ও এক ছেলেসহ অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলুর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক জানিয়েছেন। পৃথক শোকবার্তায় তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাপার চিফ প্যাট্রন রওশন এরশাদ এবং জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের পৃথক শোকবার্তায় শোক জানিয়েছেন। পররাষ্টমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান পৃথক শোকবার্তায় শোক জানিয়েছেন। শোক জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাপার কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অতিরিক্ত মহাসচিব সাহিদুর টেপাও পৃথক শোকবার্তায় শোক জানান। বাবলুর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও পার্টির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম। শোকবার্তায় জেপির নেতৃদ্বয় প্রয়াত বাবলুর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘বাবলু দীর্ঘদিন আমাদের সহকর্মী এবং একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ ছিলেন।’ বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার শোক জানিয়েছেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও শোক জানিয়েছেন।
গতকাল বাদ এশা রাজধানীর গুলশানে আজাদ মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বাবলুকে দাফন করা হয়েছে। জানাজায় জাপাসহ বিভিন্ন দলের নেতারা অংশ নেন। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধিদল জানাজায় অংশ নেয়। জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলামও জানাজায় শরিক হন। জাপার প্রবীণ নেতা অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খানও জানাজায় অংশ নেন। এর আগে মরদেহ দুপুর থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর কাকরাইলে জাপার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে রাখা হয়। জাপা ও দলটির বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। জাতীয় পার্টি-জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাদেক সিদ্দিকীর নেতৃত্বে জেপির পক্ষ থেকেও এসময় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
জিয়াউদ্দিন বাবলুর করোনা ধরা পড়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর। ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পাঁচ দিন তিনি সিলেটে অবস্থান করেন। ঢাকায় ফিরে অসুস্থ বোধ করলে ও উপসর্গ দেখা দিলে ৬ সেপ্টেম্বর করোনা পরীক্ষা করালে পজিটিভ সনাক্ত হয়। ঐ দিনই তিনি ধানমন্ডিতে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে একদিন পর তাকে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। বাবলুর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি আগে থেকে অ্যাজমা ও হার্টের জটিলতাসহ নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। করোনা সনাক্তের পর ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। গত বছর করোনায় বাবলুর ছোট ভাই মারা যান, আর এ বছর করোনায় মারা যান তার ভগ্নিপতি।
জিয়াউদ্দিন বাবলু ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এরশাদ সরকারের উপমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সাল থেকে দুই বছর এবং ২০২০ সালের ২৬ জুলাই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি জাপার মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে কয়েক মাস তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ছিলেন। নবম সংসদ নির্বাচনে মহা ঐক্যজোট গঠনে তারও ভূমিকা ছিল। তার প্রথম স্ত্রী অধ্যাপিকা ফরিদা আক্তার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। প্রথম স্ত্রীর সংসারে এক ছেলে রয়েছে। কয়েক বছর আগে বাবলু জাপার প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের ভাগ্নি মেহেজেবুন্নেসা টুম্পাকে বিয়ে করেন।
বাবলুর মৃত্যুতে তিন দিনের দলীয় শোক ঘোষণা করেছে জাপা। গতকাল থেকে আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত জাপার প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে দলীয় ও কালো পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়ে এই তিন দিনে শোকসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হবে। আজ রবিবার বিকাল ৩টায় কাকরাইলে জাপার কেন্দ্রীয় কার্যালয় চত্বরে হবে শোক সভা। পার্টির মহাসচিবের মৃত্যুতে জাপার পক্ষ থেকে শোক বই খোলা হয়েছে। গতকাল থেকে আগামীকাল পর্যন্ত জাপা চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয় ও কাকরাইলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দুটি শোক বই রয়েছে। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বিদেশি কূটনীতিকরা শোক বইতে স্বাক্ষর করবেন।
জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের তার শোকবার্তায় বলেন, জিয়াউদ্দিন বাবলু শিশু বয়স থেকেই অত্যন্ত মেধাবী হিসেবে সকল মহলে সুপরিচিতি পান। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি ও অধিকার নিয়ে সংগ্রামমুখর ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে ছাত্র সমাজের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এসময় তিনি বাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ’৮০-র দশকে তিনি ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হন। এসময় তিনি এরশাদের দলে যোগ দেন। এরশাদ তখন তাকে উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেন। জিয়াউদ্দিন বাবলু ছিলেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা সহসাই পূরণ হওয়ার নয়। তিনি তার কল্যাণময় কর্মের মাঝে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন।
