বিশ্ব কি নারীবিহীন হয়ে যাচ্ছে?

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২১, ২১:২৮

 ‘শত পুত্রে বলীয়ান হও’, মহাভারতে উল্লেখ আছে, বেদব্যাস এমন করেই গান্ধার রাজ্যের রাজকুমারী গান্ধারীকে বর দিয়েছিলন। ফলে গান্ধারী এক শ পুত্র এবং ‘দুঃশালা’ নামে মাত্র একটি কন্যাসন্তানের মা হয়েছিলেন। ভিয়েতনামের প্রবাদবাক্যে বলা হয়েছে, ‘বংশ রক্ষায় একটি পুত্রসন্তানই যথেষ্ট, দশটি কন্যাসন্তান জন্মালেও তা সম্ভব নয়’। চীনেও এমন কথা প্রচলিত আছে, ‘ছেলেসন্তান জন্ম নিলে সবাই আনন্দে চিত্কার এবং আতশবাজি ফুটিয়ে সবাইকে তা জানিয়ে দেয়। অথচ মেয়েসন্তান জন্ম নিলে সবাই নীরব থাকে’। আর বাংলাদেশে তো পুত্রসন্তানকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ‘বংশের আলো’ বলে। পৌরাণিক, লোককাহিনিসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণে এমন করেই প্রাচীনকাল থেকেই পুত্রসন্তানের জন্মকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। কন্যাসন্তানরা সেখানে অনেকটাই অবাঞ্ছিত, অনাকাঙ্ক্ষিত। আর তাই বর্তমান বিশ্ব আরেকটি নেতিবাচক বাস্তবতার সম্মুখীন বলেই গবেষক, সমাজবিজ্ঞানীরা শিরোনামের প্রশ্নটি তুলেছেন। কারণ পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাতে ভারসাম্যহীনতা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সোজা কথায়, নারীদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জাতিসংঘের তাগিদে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে একদল গবেষক ছড়িয়ে পড়েছেন দেশে দেশে। প্রথম পর্যায়ে তাঁরা বেছে নিয়েছেন এশিয়ার বৃহত্ জনসংখ্যার তিনটি দেশ, চীন, ভারত এবং ভিয়েতনাম। কারণ নারীসংখ্যা হ্রাস এই তিনটি দেশে পৃথিবীর অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি।

পুত্রসন্তান লাভের আশায় ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ, মাজার, পুণ্যস্থানে মানত, গর্ভবতীর খাবার পরিবর্তনসহ নানা কুসংস্কার আছে যা কি না মোটেই কার্যকর নয়। ফলে জন্মের পর কন্যাসন্তানকে নির্দয়ভাবে হত্যার ঘটনাও গোপন থাকেনি। আর আল্ট্রাসনোগ্রাফির আবির্ভাবের পর মাতৃগর্ভে কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা আলাদা মাত্রায় বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিকল্যান্ডের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৭০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত এই ৫০ বছরে প্রায় পাঁচ কোটি কন্যাসন্তানকে জন্ম নিতে দেওয়া হয়নি। বিপুল সংখ্যক নারী-শিশু থেকে বিশেষভাবে বঞ্চিত হয়েছে এশিয়া মহাদেশের দেশগুলো।

দ্বিতীয় পর্যায়ে নৃতাত্ত্বিক গবেষণা এবং জনসংখ্যাতাত্ত্বিক জরিপের জন্য গবেষকরা বেছে নিয়েছেন সে দেশগুলির কয়েকটি যেখানে কন্যাসন্তান জন্ম অনেকটাই অবাঞ্ছিত। এসব দেশে দম্পতিরা যখন কন্যাসন্তান জন্ম দেন, তখন তাঁরা পুত্রসন্তান লাভের আশায় খুব কম সময়ের ব্যবধানে আবারও সন্তান নিতে উদ্যোগ নেন। অথচ পুত্রসন্তান জন্ম নিলে পরবর্তী গর্ভধারণ বিলম্বিত হয়। পুত্রসন্তান জন্ম দিলে স্বামী এবং পরিবারের কাছে স্ত্রীর কদর বাড়ে। অপরদিকে পরপর কন্যাসন্তানের জন্ম দিলে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী ত্যাগের ঘটনা মোটেই বিরল নয়। এমনটাই জানিয়েছেন ভ্যালেন্টাইন বেকুয়ে, ফ্রান্সের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেমোগ্রাফিক স্টাডিজের জনমিতি বিষয়ক গবেষক। গবেষকরা নারীজনসংখ্যা হ্রাসের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলির একটি তালিকা করেছেন। তালিকাটি মোটেই ছোট নয়, এ তালিকায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া, উগান্ডা, মিশরও আছে। ফলে এ শতক ২১০০-এর শেষে আরো ২ কোটি ২০ লাখ নারী-শিশু পৃথিবীর আলো দেখবে না। নারী জনসংখ্যার মোট ঘাটতি দাঁড়াবে ৬ কোটি ৭০ লাখ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপসহ বেশকিছু উন্নত দেশে জন্মউর্বরতার হার ২-এর নিচে নেমে গেছে। আর সেখানেও পছন্দের পাল্লাটি পুত্রসন্তানের দিকেই ঝুঁকে আছে। বাংলাদেশে ১৯৭০-এ নারীপ্রতি সন্তানের সংখ্যা ছিল ৭, এখন সেখানে সে সংখ্যা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ২-তে। মনে রাখতে হবে জনসংখ্যার ঘনত্বে ভ্যাটিকান সিটিকে বাদ দিলে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্ববৃহত্তম দেশ। নারীর সংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে যোগ হয়েছে আর একটি সামাজিক সমস্যা, সেটা হলো বাল্যবিবাহ। এক ভারতেই প্রতি বছর জীবনের ১৮ বসন্তে পৌঁছানোর আগেই প্রায় ১৫ লাখ কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায়। ইউনিসেফ জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার সর্বাধিক এবং যে তালিকায় বিশ্বের সর্বাধিক বাল্যবিবাহের ১০টি দেশেকে চিহ্নিত করা হয়েছে, সে তালিকা থেকে বাংলাদেশ আজো বেরিয়ে আসতে পারেনি। (এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ: এ প্রোফাইল অব প্রোগ্রেস ইন বাংলাদেশ, ২০২০)। বাল্যবিবাহ হচ্ছে যৌন নিপীড়ন, শিশু অধিকারের ভয়াবহ লঙ্ঘন।

প্রকৃতিও নারীদের প্রতি খানিকটা যেন বিরূপ। কারণ যেখানে নারী-পুরুষের সংখ্যার অনুপাত হওয়া উচিত এক অর্থাত্ ১০০ জন নারী এবং ১০০ জন পুরুষ। সেখানে ১০০ নারী জন্ম নিলে জন্ম নেয় ১০৫ জন পুরুষ-শিশু। প্রতি ১০০ জনে পাঁচজন পুরুষ বাড়তি থেকে যাচ্ছে।

নারী জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে ভারতে অনেক গ্রাম ইতিমধ্যে নারীশূন্য হয়ে পড়েছে। অনেক পুরুষ বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজে পাচ্ছে না। ২০৮০-তে প্রায় চার কোটি ভারতীয় পুরুষ বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজে পাবে না। ২০১৪ থেকে চীনে প্রতি বছর নারীর তুলনায় ১৩ লাখ পুরুষ বেশি জন্ম নিচ্ছে। এমন চলতে থাকবে অন্তত ২০৪১ পর্যন্ত (জার্নাল অফ ফ্যামিলি ইস্যুস, ২০১৪)। ফলে প্রান্তিক পুরুষদের আজীবন নারী বিহীন, চিরকুমার জীবন কাটাতে হবে। আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার আরো বেশ কয়েকটি দেশে এমন সমস্যা প্রকট হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীর এমন বিপুল এবং দ্রুত সংখ্যা হ্রাসে সামাজিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাবে। পুরুষদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বিঘ্ন ঘটবে, একাকিত্ব, হতাশা, ক্রোধ তাদেরকে গ্রাস করবে। নারী পাচার, নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়বে এবং অপরাধ বৃদ্ধি পাবে। নারী-পুরুষ উভয়ের উপর পড়বে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব যা কি না সমাজের জন্য মোটেও কল্যাণকর হবে না। আর তাই আজ বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন; প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্ব কি নারী বিহীন হয়ে যাচ্ছে?

n লেখক :ফ্রান্সপ্রবাসী গবেষক