ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তামান্না-জ্যোতি জয় করছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২১, ২২:৪৪

শহিদ মশিউর রহমান ডিগ্রি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জ্যোতি হোসেন। পুরো শরীর তার প্যারালাইজড। মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে জ্যোতি ভর্তি হয়েছেন উচ্চমাধ্যমিকে। ভবিষ্যতে একজন চিকিত্সক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন জ্যোতি। তার এই স্বপ্নের পথে সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে আছেন মা। জ্যোতির মতোই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে চলেছেন তামান্না নূরা। সৃষ্টির অজানা রহস্যে এক পা নিয়ে জন্ম নিয়েছেন তামান্না; একটিও হাত নেই তার। শিক্ষক বাবা রওশন আলী ও মা খাদিজা পারভীনের দুই মেয়ে এক ছেলের মধ্যে তামান্নাই বড়। জ্যোতির মতোই তামান্নাও বড় স্বপ্ন দেখেন। বড় হয়ে একজন বিসিএস কর্মকর্তা হতে চান তিনি। গত ২৩ সেপ্টেম্বর যশোরের ঝিকরগাছা এলাকায় কথা হয় জ্যোতি ও তামান্নার সঙ্গে। সে সময় পাশে ছিলেন তাদের দুজনের বাবা-মা। শারীরিক প্রতিবন্ধী এই দুই মেয়ের বাবা-মা জানালেন মেয়েকে নিয়ে তাদের স্বপ্নের কথা।

দুই হাত আর এক পা না থাকায় তামান্নার মা-বাবাকে কাছের মানুষদের থেকে সইতে হয়েছে বঞ্চনা। অনেক আপনজনও তাদের সংস্পর্শ ত্যাগ করেছেন।                একটু বড় হলে মা-বাবা বুঝতে পারেন মেয়ের আছে প্রবল লেখাপড়ার আগ্রহ। এই মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে মা শুরু করেন অন্যরকম এক যুদ্ধ। মা-মেয়ের সেই যুদ্ধে শামিল হন বাবাও। মেয়েকে প্রথম যখন স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাকে ভর্তি পর্যন্ত নিতে চায়নি স্কুল। অনেক বুঝিয়ে তামান্নাকে স্কুলে ভর্তি করতে সমর্থ হন তারা। এক পা দিয়ে লিখেই তামান্না এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। পা দিয়ে ছবি একেই ক্লাসে প্রথম হয় নুরা।

অন্যদিকে জ্যোতির যখন সাড়ে চার বছর বয়স, তখন খেলতে গিয়ে পড়ে স্পাইনাল কর্ডে আঘাত লাগে। তারপর স্থানীয় অনেক চিকিত্সা শেষে ঢাকার সাভারে সিআরপিতে দীর্ঘদিন চিকিত্সা শেষে বাড়ি ফেরেন। এরই মধ্যে দুই বছরের ছোট বোন জেবার স্কুলে যাওয়ার সময় হয়। তার সঙ্গে জ্যোতিও স্কুলে যেতে মনস্থির করে। সেদিন তার মা তাকে না নিয়ে পারেননি। বাড়ির সবাই বাদ সাধে। শুধু বাড়িতেই নয়, স্কুলের শিক্ষকেরাও জ্যোতিকে স্কুলে আনতে বারণ করেন। মা মেয়ের মন রক্ষার জন্য শিক্ষকদের অনেক বুঝিয়ে স্কুলে ভর্তি করাতে সমর্থ হন। স্কুলে যাতায়াত করাটাই জ্যোতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে মা রোকসানা এত দিন সব বাধা জয় করে প্রতিদিন মেয়েকে নিয়ে গেছেন স্কুলে। এসএসসিতে জ্যোতির ফলাফল সবাইকে চমকে দেয়। জিপিএ-৫ পাওয়ার পাশাপাশি পুরো স্কুলে প্রথম স্থান অর্জন করেন জ্যোতি। দূরদূরান্ত থেকে জ্যোতিকে দেখতে আসতে শুরু করে মানুষ।

লকডাউনের দিনগুলোতে জ্যোতি অপেক্ষা করেছে—কবে কলেজ খুলবে, কবে ক্লাস করবে। তবে কলেজ খোলার দুই সপ্তাহ পার হলেও ক্লাস করা হচ্ছে না জ্যোতির। মায়ের অসুস্থতার জন্য ক্লাস করতে পারছেন না। জ্যোতির মা বলেন, ‘জ্যোতি স্কুলে শিক্ষা বৃত্তি পেয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়েছে। লকডাউনের কারণে কলেজ বন্ধ থাকায় কলেজ থেকে কোনো প্রকার সহযোগিতা পায়নি। তবে এখন কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে তার চাওয়া, জ্যোতির কলেজে যাতায়াতের ব্যবস্থাটা অন্তত কেউ করে দিক।’

জ্যোতির স্কুল ঝিকরগাছা পাইলট গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আহসান উদ্দিন বলেন, জ্যোতির মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য বিশেষ সহযোগিতা করেন। এদের সহযোগিতার জন্য সরকার কিংবা বেসরকারি পক্ষ থেকে স্কুল কোনো সহযোগিতা পায় না। তবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা উপবৃত্তি পায়। মেধাবী জ্যোতির উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষ সহযোগিতার প্রয়োজন।

তামান্ন নুরাকেও স্কুল ভর্তি নিতে চায়নি। অনেক বুঝিয়ে জায়গা হয় তার স্কুলে। বাঁকরা জে কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে তামান্না ভর্তি হয় বাঁকরা ডিগ্রি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে। কীভাবে পায়ে লেখা আয়ত্ত করলেন প্রশ্ন করলে তামান্না বলেন, ‘মা-ই আমাকে পা দিয়ে লেখা শেখান।’ মিষ্টি হেসে তামান্না বলেন, ‘আমি পা দিয়ে হাঁটা ছাড়া সব কাজ করতে পারি। আমার মা-বাবা, ভাইবোন সবাই আমাকে সহযোগিতা করে।’ পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞানেও মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তামান্না। বিজ্ঞান কুইজ প্রতিযোগিতায় উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছেন তিনি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তির উপপরিচালক রওশন আরা লাইজু বলেন, উপবৃত্তির ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি শুরু হয়।

অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এলবার্ট মোল্লা জানান, সরকারের ১২০টি সামাজিক নিরাপত্তা স্কিম আছে, যার মধ্যে প্রতিবন্ধী সম্পর্কযুক্ত ১০টি। এই ১০টির মধ্যে সরাসরি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি পায় দুটি। প্রথমত প্রতিবন্ধী ভাতা। দ্বিতীয়ত শিক্ষা উপবৃত্তি।

মেধাবী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী মো. আশরাফ আলী খান খসরু ইত্তেফাককে বলেন, এই মুহূর্তে নেই। আস্তে আস্তে হবে। তবে প্রতিবন্ধী মেধাবী শিক্ষার্থদের কোনো কিছুর অভাবে শিক্ষা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে তারা বিশেষ ব্যবস্থা নেন এমন নজির আছে।