অপুর মৃত্যুর সঠিক তদন্ত চান বাবা-মা

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ০৩:১১

মাসুদ আল মাহাদি অপুর বাবা-মা মানতে পারেন না যে তাদের ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে। তারা বিশ্বাসই করেন না ছেলে বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার আগে আত্মহননের পথ বেছে নেবে।

বাবা হুমাউনের অভিযোগ-তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। মা শোকে বারবার মূর্ছা যান আর বাড়ির সামনে ছেলের কবরের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। এক সপ্তাহ আগে ঢাকার এক মেসে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে অপুর।

মেধাবী এ তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্সে দ্বিতীয় হয়েছিল। তার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার দক্ষিণ সোহাগদল গ্রামে। বাবা মো. হুমাউন কবির একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (মুদি দোকানি)। দরিদ্র পরিবারের সন্তান অপু। দুই ভাইয়ের মধ্যে অপু ছিলেন বড়। তার ছোট ভাই মো. ফয়সাল ঢাকা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

অপুর পিতা মো. হুমাউন কবির জানান, ২০০৯ সালে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় অপু। পরে উপজেলা সদরের শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়। ২০১১ সালে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ লাভ করে। স্বল্পভাষী, সদালাপী, কৃতী এ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৫ম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১৩তম স্থান লাভ করেও স্বপ্নসাধ পূরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয় ভর্তি হন।

অপু শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠকও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

অপু তার লেখাপড়ার খরচ জোগাতে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে দৈনিক ইত্তেফাকের স্পোর্টস বিভাগে সাব এডিটর পদে, পরবর্তী সময় প্রথম আলো পত্রিকাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ২০১৮ সালে মাস্টার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় হন। শিক্ষাজীবন শেষে অপুর স্বপ্ন ছিল বিএসএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়া। দেশের সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করবেন। দরিদ্র পরিবারে সচ্ছলতা আনবে। ৪১তম বিসিএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে পাশও করেছেন, লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

অপুর সে স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে গেল। আর কোনোদিন সে স্বপ্ন পূরণ হবে না। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার চাঁনখারপুল এলাকার নাজিমুদ্দিন রোডের একটি ভবনের একটি কক্ষ থেকে অপুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে চকবাজার থানা পুলিশ।

তার ছোট ভাই ফয়সাল জানান, অপুর মৃত্যুর ঘটনায় তার দায়ের করা এজাহারে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হলেও পুলিশের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত তারা অন্ধকারে আছেন ভাইয়ের মৃত্যুর কারণ নিয়ে। 

তবে তাদের আত্মীয় ঢাকা মহানগর চিফ জুডিশিয়াল আদালতের অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন ইত্তেফাককে বলেন, অপুর মৃত্যু যে হত্যাজনিত তা অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হয়। তিনি মরদেহ দেখার পর এ কথাই জোরের সঙ্গে বলা যায়, এটা আত্মহত্যা নয়। 

তিনি বলেন, ওর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ছেলেটি যেমন মেধাবী ছিল তেমনি ছিল মুক্তমনা, প্রগতিশীল চিন্তার ধারক-বাহক। কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শে নিজেকে না জড়ালেও চিন্তা-চেতনায় ছিল প্রতিবাদের ছাপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ন্যায্য অধিকার আদায়ে সোচ্চার ও সক্রিয় থাকলেও নিজে এর প্রাপ্য গ্রহণ করেননি। এমনও হতে পারে এই অধিকার সচেতনতাই তার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কোনো কারণ।

ইত্তেফাক/এএএম