গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনকালে এক সিনিয়র সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণাকর্ম জোরদার করিবার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। অত্যন্ত হতাশার বিষয় হইল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মূল কার্যক্রম গবেষণা হইলেও এই বিষয়টিই সকলের চাইতে অবহেলিত ও উপেক্ষিত। ফলে বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নাই। গবেষণাকর্ম না হওয়ার পিছনে অনেক সময় বাজেট-স্বল্পতাকে দায়ী করা হয়। তবে আমাদের মতে, ইহাই প্রধান কারণ নহে। গবেষণামনস্ক ও মেধাবী শিক্ষক যথারীতি নিয়োগ পাইতেছেন কি না ইহাও আজ বিবেচ্য বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বাস্তবতা হইল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের অন্ত নাই। এই প্রবণতাই আমাদের উচ্চ ও গবেষণামূলক শিক্ষা কার্যক্রমের ধ্বংস ডাকিয়া আনিতেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরিয়া ইহার কোনো প্রতিকার মিলিতেছে না। যেই সকল উপাচার্য বা দায়িত্ববান শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠে, অনেক ক্ষেত্রে তাহাদের অপসারণ করিয়াই দায়িত্ব শেষ করা হয়। উপযুক্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না বলিয়া এই ধরনের অপকর্ম বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে একসময় মেধাবীরাই প্রভাষক পদে নিয়োগ লাভ করিতেন। পদোন্নতিতে গবেষণা অগ্রাধিকার লাভ করিত। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরিয়া বিশেষত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত নানা অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে নিয়োগশর্ত পর্যন্ত পরিবর্তন করা হইতেছে। মেধা তালিকায় ৫০-এর পর থাকা ব্যক্তিকেও নিয়োগ দেওয়া হইতেছে নানা কায়দায়। রাজনৈতিক পরিচয় তো বটে, লোক দেখানো পরীক্ষায় টাকার বিনিময়ে অনুগত বা বিশেষ সম্পর্কের জোরে শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি দেওয়া হইতেছে। প্রভাষক পদে নিয়োগ দিতে প্রথম সেমিস্টারের ফল দেখিয়াই একশ্রেণির শিক্ষক নীলনকশা শুরু করেন এবং সেই শিক্ষার্থীটি যাহাতে ক্লাসের পরীক্ষায় প্রথম হইতে পারেন, সেই ধরনের পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজকর্ম করিয়া দেওয়ার মাধ্যমেও কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অধিক নম্বর দেওয়ার অভিযোগ নূতন নহে। সম্প্রতিকালে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ছেলেমেয়ে, জামাতা, পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়কে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে নতুন মাত্রা যোগ হইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক উপাচার্যরাই এই অভিযোগে অধিক অভিযুক্ত। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংক্রান্ত ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসির তদন্তে প্রমাণিত হইয়াছে। আইন সংশোধন করিয়া পূর্বের আইনে ফিরিয়া যাইবারও নজির রহিয়াছে। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়ে ইউজিসি গত কয়েক মাসে অন্তত ৯টি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করিয়াছে। আরো আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রহিয়াছে। ইহাতে এই সংক্রান্ত অনিয়মের একটি সম্যক চিত্র ফুটিয়া উঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে মান বজায় রাখিবার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি স্ট্যান্ডার্ড নীতিমালা করিয়া দিয়াছে। এই নীতিমালাটি অনুসরণ করা যাইতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নত করিতে শিক্ষক নিয়োগে সকল প্রকার স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম দূর করিতে হইবে। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন রহিয়াছে এবং ইহা দ্বারা তাহারা স্বাধীনতা ভোগ করিয়া থাকেন। কিন্তু এই স্বাধীনতার নামে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া বাঞ্ছনীয় নহে, যাহাতে যোগ্য ও মেধাবীরা শিক্ষক নিয়োগ লাভে বঞ্চিত হন। ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগের উপর সেই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ভাবমূর্তি বৃদ্ধি বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাই কোনো অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার আত্মঘাতী কাজ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করিতে পারেন না। বিজ্ঞপ্তির অতিরিক্ত নিয়োগ বা বিজ্ঞপ্তি না দিয়াই নিয়োগের ঘটনাও অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি। হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাহাকে অনুসরণ করিবেন, ইহাই স্বাভাবিক। তাহার দ্বারা যখন কোনো অনিয়ম সংঘটিত হয়, তখন জাতি হিসাবে আমাদের লজ্জার শেষ থাকে না। আমরা আশা করি, পাবলিক-প্রাইভেট সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হইবে।
