‘প্যান্ডোরা পেপার্স’ নামক গোপন আর্থিক দলিলপত্র ফাঁসের ঘটনায় তোলপাড় সারা বিশ্ব। এর সঙ্গে কি প্যান্ডোরার বাক্সের কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
গ্রিক পুরাণ মতে, প্যান্ডোরা হলেন পৃথিবীর প্রথম নারী। প্যান্ডোরার গ্রিক অর্থ হচ্ছে ‘যিনি সব উপহার বহন করেন’। অলিম্পাসের দেবতারা টাইটানদের কাছ থেকে স্বর্গ ছিনিয়ে নেওয়ার কিছুকাল পর পৃথিবীকে নতুন করে সাজিয়ে নতুন প্রাণী সৃষ্টি করার কথা ভাবেন। এই গুরুদায়িত্ব বর্তায় দুই ভাই এপিমিথিউস ও প্রমিথিউসের ওপর। এপিমিথিউস পৃথিবীতে নতুন প্রাণী সৃষ্টি করেন এবং তাদের ভালো গুণ উপহার দেন। অন্যদিকে প্রমিথিউস স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে তুলে দেন মানবজাতির হাতে। আগুন চুরি করায় দেবরাজ জিউস প্রমিথিউসের ওপর রেগে যান এবং তাকে একটি পর্বতের গায়ে অনন্তকালের জন্য বন্দি করে রাখেন। জিউস ভেবেছিলেন মানবজাতি আগুন পেলে তা খারাপ কাজে ব্যবহার করবে। এ কারণে মানবজাতিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সুকৌশলী জিউস অগ্নি দেবতা হিফিস্টাসকে নির্দেশ দেন এক নারীকে সৃষ্টি করার। দেবতা হারমিস সেই নারীর নাম রাখেন প্যান্ডোরা। বহু দেব-দেবীর আশীর্বাদ পেল স্বর্গীয় বালিকা প্যান্ডোরা। দেবী আফ্রোদিতি তাকে দিলেন হূদয়ে গভীর আবেগ ধারণের ক্ষমতা, দেবতা হারমিস দিলেন ভাষার ওপর দক্ষতা, দেবী অ্যাথেনা উপহার দিলেন শিল্প সৃষ্টির দক্ষতা। তবে দেবতারাজ জিউস প্যান্ডোরাকে দুটি বিশেষ উপহার দেন—প্রচণ্ড উত্সুক মন আর সুসজ্জিত একটি বাক্স। বাক্সটি ছিল প্রচণ্ড ভারী এবং খুব শক্তভাবে আটকানো। জিউস প্যান্ডোরাকে সাবধান করে দেন—বাক্সের ভেতরে যা রয়েছে তা কোনো মরণশীল মানুষের জন্য নয়। কোনোভাবেই যেন বাক্সটি খোলা না হয়।
দেবরাজ জিউস প্রমিথিউসকে শাস্তি দেওয়াতে ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে এপিমিথিউস শোকে কাতর হয়ে পড়েন। এ কারণে প্যান্ডোরাকে দেবতাদের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পাঠানো হয় এপিমিথিউসের কাছে। প্রমিথিউস আগেই তাঁর ভাইকে দেবতাদের কোনো উপহার গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু প্যান্ডোরাকে দেখামাত্রই প্রেমে পড়ে যান এপিমিথিউস। আর প্যান্ডোরাও পৃথিবীর জীবন নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। তবে উত্সুক মন আর সবকিছু সম্পর্কে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় অধৈর্য প্যান্ডোরার মনে প্রশ্ন জাগে, জিউসের দেওয়া বাক্সে কী এমন গোপনীয় জিনিস রয়েছে যা কোনো মরণশীল মানুষ দেখতে পারবে না? তাহলে কেনই বা তাকে এমন একটি বাক্স উপহার দিলেন জিউস? বাক্সটি খোলার জন্য অস্থির হলো প্যান্ডোরা। একদিন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে এপিমিথিউসের চোখ এড়িয়ে বাক্সটি খুলতে খুলতে প্যান্ডোরা ভাবতে লাগল কী আছে একবার দেখেই আজীবনের জন্য সেটি বন্ধ করে দেবে। কিন্তু বাক্সটি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট আওয়াজ করতে করতে বেরিয়ে এলো অসংখ্য দৈত্য দানব। ধোঁয়ার তৈরি দৈত্যগুলো প্যান্ডোরার চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগল। প্রচণ্ড ভয় পেলেও প্রাণপণ চেষ্টা করে দৈত্যগুলোকে আবার বাক্সের ভেতরে আটকে ফেলতে চাইল সে। কিন্তু ততক্ষণে অশুভ শক্তিসম্পন্ন সেই দৈত্যগুলো ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে। মূলত দেবতারাজ জিউস মানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য যত রোগ, জরা, হিংসা, দ্বেষ, লোভ, মিথ্যা ইত্যাদি সৃষ্টি করেছিলেন, সেইসব জমা করে রেখেছিলেন প্যান্ডোরাকে উপহার দেওয়া বাক্সে। প্যান্ডোরা যখন নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হচ্ছিল তখন হঠাত্ বাক্স থেকে স্বর্গীয় এক সংগীত শুনতে পায়। বাক্সটি আবার খুলতেই স্বর্গের উজ্জ্বল আলোতে চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে আর প্যান্ডোরার দুঃখ-কষ্টও অনেকটা কমে যায়। প্যান্ডোরা বুঝতে পারে, সব অশুভ শক্তি আর দুঃখ-দুর্দশা তার মাধ্যমেই পৃথিবীতে আনতে চেয়েছিলেন দেবতা জিউস। এটিই ছিল তার বিধির লিখন আর এসব নিয়েই মানুষকে জীবনযাপন করতে হবে।
