চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস বলতেন, ‘সবকিছুর মধ্যেই সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সবাই এটি দেখতে পায় না।’ হয়তো মানুষ চোখ দিয়ে সব দেখতে চায়, মন দিয়ে দেখতে চায় না। আপাতদৃষ্টিতে দেখাটা সহজ বলে মনে হলেও দেখার বাইরের দেখাটা আরো কঠিন, এর চেয়ে কঠিন বোধ হয় পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। দর্শন শব্দটা বাংলা ভাষায় সংস্কৃত থেকে এসেছে, যার অর্থ দেখা। এই দেখাটা কতটা বড়, কতটা গভীর, কোথায় তার গন্তব্য, কেমন তার যাত্রাপথ সেটা নির্ভর করে দেখার শক্তিকে মানুষ কতটা তার ভেতরে তৈরি করতে পারে তার ওপর।
চোখে দুরবিন ঝুলিয়ে দূরকে কাছে এনে দেখাটা তো আর দেখা নয়, সেটা দুরবিন দিয়ে দেখার চেয়ে কাছে গিয়ে দেখাটা বেশি যৌক্তিক। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুব ছোট একটা উপাদানকে দেখা হয়তো যায়। সেটা যে কেউ দেখতে পারে। তবে সেটার ভেতরের সত্যকে সবাই দেখতে পারে না। বুঝতে পারে না। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভিদের ভেতর প্রাণ দেখেছিলেন। তখন সেটা আর কেউ দেখতে পায়নি। সবাই সবকিছু দেখতে পায় না, কেউ কেউ পায়। যেটা হয়তো আছে, হয়তো নেই, তার পরও কেমন করে যেন মনকে বলছে, কী যেন দেখা যাচ্ছে যাচ্ছে করে আর দেখা যাচ্ছে না। তবে সেটার অস্তিত্ব মাথার চারপাশে বনবন করে মশার মতো ঘুরছে অথচ পাব পাব বলে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো সেটা কিছু নয়, আবার অনেক কিছু। এই অদৃশ্যের ভেতর ডুবে থাকা অস্তিত্বকে খুঁজতে খুঁজতে যদি সেটা খুঁজে পাওয়া যায়, তবে দেখার শক্তিটা অদেখা শক্তির সঙ্গে লড়তে লড়তে জিতে যায়।
একটা সংগৃহীত গল্পের কথা মনে পড়ল। যেটা সত্যের পেছনেও যে সত্য থাকে সে শিক্ষা আমাদের দেয়। একটা সত্য ততক্ষণ মিথ্যা থাকে যতক্ষণ শেষের সত্যটা জানা যায় না। পৃথিবীতে সত্যকে সবাই দেখতে পায় না, সত্য নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসে। আর মিথ্যে সবার সামনে এসে তার মতো করে মিথ্যাকে সত্য বানাতে ভালোবাসে। সেটা যা-ই হোক। গল্পটা ছিল এমন :‘একবার একটা লঞ্চ দুর্ঘটনায় পড়ল। লঞ্চের এক দম্পতি একটা লাইফবোট পেল। কিন্তু স্বামীটা বুঝে ফেলল সেখানে একজনের বেশি উঠতে পারবে না। লোকটা তার স্ত্রীকে পেছনে ঠেলে দিয়ে নিজে লাফিয়ে উঠে পড়ল। ডুবন্ত লঞ্চে দাঁড়িয়ে থেকে মহিলা স্বামীর উদ্দেশে একটাই মাত্র বাক্য চিত্কার করে বলেছিল।
শিক্ষক এটুকু বলে থামলেন, চারদিকে তাকিয়ে ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া বুঝতে চাইলেন, ‘তোমাদের কী মনে হয়? কী বলেছিল মহিলা?’ ‘তুমি একটা ইতর, আমি কী অন্ধই না ছিলাম!’ অধিকাংশ ছাত্রই এ ধরনের জবাব দিল। শিক্ষক খেয়াল করলেন একটা ছেলে পুরোটা সময় ধরেই চুপ, তার মতামত জানতে চাইলে সে বলল, ‘স্যার, আমার বিশ্বাস, মহিলাটি বলেছিল, ‘আমাদের বাচ্চাটার যত্ন নিয়ো, ওকে দেখে রেখো।’
বিস্মিত হয়ে শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি এই গল্প আগে শুনেছ, তাই না!’ ছেলেটি মাথা নেড়ে জবাব দিল, ‘আমার মাও অসুখে মারা যাওয়ার পূর্বমূহূর্তে বাবাকে এ কথাই বলেছিল।’
শিক্ষক একমত হলেন, ‘তুমিই ঠিক।’
লঞ্চটা ডুবে গেল এবং বাড়ি ফিরে লোকটা একাকী মেয়েকে যত্ন করে বড় করল। লোকটি মারা যাওয়ার বেশ কয়েক বছর পরে তাদের কন্যা বাবার একটি ডায়ারি পেল। সেখানে সে আবিষ্কার করল, লঞ্চযাত্রায় যাওয়ার আগেই মায়ের দুরারোগ্য অসুখ ধরা পড়েছিল, চরম মুহূর্তে তার বাবা তাই বাঁচার একমাত্র উপায়ের সদ্ব্যবহার করেছে।
ডায়ারিতে তার বাবা লিখেছে, ‘আমারও তোমার সাথে সাগরের তলে ডুবে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু শুধু মেয়ের কথা ভেবে তোমাকে একাই সাগরতলে চিরদিনের জন্য ছেড়ে আসতে হলো।’
গল্প শেষ হলো, ক্লাস একদম চুপ।
শিক্ষক বুঝলেন, ছাত্রেরা গল্পের শিক্ষাটা ধরতে পেরেছে। ভালো ও মন্দ, পৃথিবীর সবকিছুর পেছনেই অনেক জটিলতা আছে, যা সব সময় বোঝা যায় না।’
মানুষ নানা রঙের নানা ঢঙের ফুল দেখে বিমোহিত হয়, বিস্মিত হয়, ব্যাকুল হয়। অথচ ফুলের গন্ধ, সে গন্ধের বৈচিত্র্য মানুষ হয়তো অনুভব করতে পারে কিন্তু চোখের দেখায় তা কখনো দেখা হয়ে ওঠে না। তবে কেউ কেউ সে গন্ধটা দেখতে পায়। যখন চিন্তাশক্তির ওপর ভর করে কল্পনাশক্তি তৈরি হয়। মানুষ তার নিজের মতো করে কল্পনায় একটা ছবি তৈরি করে নেয়। সে ছবি যদি কল্পনার সুতোয় ঝুলতে ঝুলতে বিজ্ঞানের ধারণা দ্বারা পুষ্ট হয়, তখন অদেখা সত্যটা দৃশ্যমান সত্যে পরিণত হয়।
মানুষ জানে, সে যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন সে কিছুই জানবে না। বুঝতে পারবে না। ঘুমের সময়টা সে আছে কিংবা নেই সে অনুভূতি শক্তিটাও তার থাকবে না। ঘুম যে মানুষকে তার অস্তিত্ব থেকে টেনে কোথায় নিয়ে যায় তা বোঝাটা খুব কঠিন। খুব অনিশ্চিত এই ঘুম। তার পরও মানুষ ঘুমের জন্য ব্যাকুল হয়। মানুষ ডুব দেয় ঘুমের অতল সমুদ্রে, এরপর যতই মানুষ ডুবতে থাকে ততই তার নিজের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলে। ঘুম নিয়ে মানুষের এই মনস্তত্বটা খুব অদ্ভুত, যেটা জীবনকে টানতে টানতে একটা অচেনায় নিয়ে যায়, সেটা মানুষ জানে তার পরও মানুষ ঘুমাতে চায়। পৃথিবীর সবাই জানে, বিছানায় পড়ে থাকা দেহের ভেতরের মানুষটা ঘুমাচ্ছে অথচ ঘুমন্ত মানুষটা জানে না সে কী করছে। তার পরও কেউ কেউ ঘুমের মধ্যে নিজেকে অনুভব করতে পারে। কেউ কেউ নিজের ঘুমিয়ে থাকা সত্তাকে দেখতে পায়। এই দেখাটা চোখের দেখা নয়, এটা এমন এক দেখা যেটা দেখতে হলে মানুষকে তার ভেতরের মানুষের মধ্যে প্রবেশ করতে হয়।
মানুষের যদি প্রকৃতি, সময় ও মানুষ সম্পর্কে নিবিড় জ্ঞান থাকে তখন ঘুমন্ত সত্তায় মানুষ জীবন্ত সত্তার বীজ বপন করে। এভাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গভীর থেকে গভীরতর হয়। সেই গভীরতা মানুষকে ঘুমের ভেতর দিয়ে এমন এক পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দেয় যেখানে দর্শনতত্ত্ব অলৌকিক আনন্দের ভারে নুয়ে পড়ে মানুষকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়। বড় বড় বই পড়ে মানুষ দার্শনিক হয় না, মানুষ যখন নিজেই বই হয়ে উঠতে পারে তখন সবার অজান্তে একজন বিখ্যাত দার্শনিকের জন্ম হয়। কাগজের বইয়ের অক্ষরগুলো পরিবর্তিত হয় না, মানুষ যখন বই হয় তখন মানুষের চিন্তাশক্তির অক্ষরগুলো ক্রমাগত গবেষণা করতে করতে উন্নত ধারণা দ্বারা পরিবর্তিত হয়। মানুষ যখন বই হয়ে ওঠে তখন মানুষ সত্যের ভেতরের সত্যকে দেখতে পায়।
একটা বিখ্যাত চিত্রকর্মের ভাবার্থ মনে পড়ল। যেখানে বলা হচ্ছে, যেটাকে আমরা সত্য বলে চোখে দেখছি সেটা নাকি সত্য নয়, সত্যের মুখোশপরা মিথ্যে। এ প্রসঙ্গে ফরাসি একজন চিত্রকর জিনলেওন জেরোমের ১৮৮৬ সালে আঁকা বিখ্যাত একটি ছবি The truth is coming out of the well-এর বিষয়বস্তুকে টেনে আনা যায়। উনিশ শতকের একটি লোককথাকে ভিত্তি করে ছবিটি আঁকা হয়েছিল। গল্পটা ছিল এ রকম :একবার সত্য ও মিথ্যা পরস্পরের সঙ্গে দেখা করল কিছু বিষয় মীমাংসার তাগিদে। হাঁটতে হাঁটতে তারা চলে গেল একটা কুয়োর পাশে। মিথ্যা বলল, দেখো, কী পরিষ্কার পানি। চলো গোসল করি। বলা বাহুল্য, সত্য বিশ্বাস করেনি মিথ্যার কথা। নিজে পরখ করে দেখল। যখন দেখল কুয়োর জল সত্যিই পরিষ্কার তখন মিথ্যার প্রস্তাবে রাজি হলো। দুজনে পোশাক ছেড়ে নেমে পড়ল কুয়োয়। গোসলের মাঝপথে মিথ্যা কুয়ো থেকে উঠে এসে সত্যের পোশাক পরে পালিয়ে গেল। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর মিথ্যাকে ফিরতে না দেখে সত্য উঠে এলো কুয়ো থেকে। না, মিথ্যা তো কোথাও নেই, পোশাকও নেই। রাগে অন্ধ হয়ে সত্য বের হলো মিথ্যাকে খুঁজতে কিন্তু নগ্ন সত্যকে দেখে ছি ছি করল সভ্য মানুষ। এমনকি তেড়েও এলো অনেকে। সত্য অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের বোঝাতে না পেরে রাগে-দুঃখে অপমানে ফের কুয়োয় নেমে গেল। তারপর থেকে সত্যকে আর কখনো কেউ দেখেনি। যাকে দেখেছে কিংবা দেখছে সে সত্যের পোশাক পরা মিথ্যা।
এই সত্য-মিথ্যা চেনাটা খুব দরকার। যেটা খালি চোখ দিয়ে চেনা যায় না। এমন একটা চোখ দিয়ে এটাকে দেখতে হয়, যা কপালের নিচের দুই চোখের মতো হয় না বরং তা অনুভূতিশক্তি দ্বারা তাড়িত চোখ হয়। কল্পনার ওপর ভর করে চিন্তার চোখ হয়। অবহেলায় পড়ে থাকা মানুষটার চোখ হয়। প্রতিদিনের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা জীবনের চোখ। যেখানে জীবনবোধ প্রতিদিন আগুনে পুড়তে পুড়তে নতুন নতুন চোখের জন্ম দেয়। সে চোখগুলোতে জল থাকে, আবেগ থাকে, ভালোবাসা থাকে। স্বপ্ন থাকে, বিশ্বাস থাকে, দেখার বাইরের দেখাকে খুঁজে বের করার শক্তি থাকে। মানুষ যে চোখে চশমা পরে সেটা চোখ নয়, মানুষের যে চোখে চশমা দরকার হয় না, সেটাই আসল চোখ। যে চোখ জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে সত্য-মিথ্যা, ভালোমন্দকে বিচার করতে পারে। সেই চোখটার জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি হচ্ছে প্রতিদিন। তার পরও সে চোখের আলোয় বদলে যাক মানুষ। কারণ সে চোখ মানুষের সঙ্গে কখনো প্রতারণা করে না।
n লেখক: অধ্যাপক ও সাবেক ডিন, মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং,
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
