বাংলাদেশে কাগজ রিসাইক্লিং

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩২

আশিক মাহমুদ

কাগজ রিসাইক্লিং হচ্ছে কাগজ পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রক্রিয়া, যার দ্বারা বর্জ্য কাগজ নতুন কাগজে রূপান্তরিত হয়। ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া ঢেউখেলানো পত্র, পুরাতন ম্যাগাজিন, পুরনো খবরের কাগজ, অফিসের কাগজ এবং বাসায় ব্যবহূত অন্যান্য কাগজ থেকে এই রিসাইক্লিং করা হয়।

কম্পিউটারের এই যুগে কাগজের ব্যবহার কমার বদলে বেড়ে চলেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর। কাগজের জোগান দিতে প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার বনজঙ্গল! বেড়ে চলেছে এমনসব গাছপালার প্লান্টেশন বা বাগান, যা দিয়ে কাগজের মণ্ড তৈরি করা যায়। অথচ গাছের কাঠ থেকে নতুন কাগজ তৈরি না করে পুরানো কাগজের রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার করলে পরিবেশের অনেক কম ক্ষতি হবে।

দেশে উত্পাদিত কাগজ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ প্রিন্টিং প্রেসসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে দেশের কাগজ। বিগত অর্থবছরেও ১৬৮ কোটি টাকার কাগজ রপ্তানি করেছে মিলগুলো। বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে ৫৫টি কাগজ কল রয়েছে। আধুনিক কাগজ তৈরির এসব কারখানায় প্রধানত আমদানিকৃত রাসায়নিক মণ্ড ব্যবহার করে উন্নতমানের কাগজ তৈরি করা হয়। আবার এখানে পুরাতন কাগজকে পুনরায় মণ্ডে রূপান্তর করে কাগজ তৈরির ব্যবস্থাও রয়েছে। এছাড়া পাটের কাটিং ও শলা মণ্ড তৈরির কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। এসব কাগজ কলে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার টন কাগজ উত্পন্ন হয়।

অপরিকল্পিত কাগজ উত্পাদনের লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে এবং রিসাইক্লিংয়ের প্রতি উত্সাহী হতে হবে। কেননা কাগজ উত্পাদনে কাঠ ও বাঁশ প্রধান কাঁচামাল। এতে সরাসরি পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। কাগজ তৈরির জন্য কাঠের বেড়ে চলা চাহিদার পরিণাম ভয়াবহ। কাঠের অন্যান্য ব্যবহারের সঙ্গে এই বাড়তি চাহিদা যোগ হওয়ার ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চল। তাছাড়া শুধু যে গাছ কাটা হচ্ছে তাই নয়, সেইসঙ্গে জঙ্গলের স্বাভাবিক গাছপালা ধ্বংস করে খালি জায়গায় লাগানো হচ্ছে এমন সব গাছ, যা দ্রুত বেড়ে উঠবে এবং যা থেকে কাগজ তৈরির উপযোগী তন্তু পাওয়া যাবে। তাই লাগামহীন কাগজ উত্পাদন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই কাগজ রিসাইক্লিংয়ের প্রতি আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। কাগজ রিসাইক্লিংয়ের রয়েছে নানা পরিবেশগত উপকারিতা, পাশাপাশি যেহেতু পুরাতন কাগজ থেকে নতুন কাগজ উত্পাদন করা যাচ্ছে সেক্ষেত্রে কাঁচামাল ক্রয়ের খরচ কমে আসবে।

প্রথমত পুরাতন কাগজ সংগ্রহ করা, হতে পারে তা খবরের কাগজ, অফিসের কাগজ, ম্যাগাজিন এবং বাসায় ব্যবহার করা কাগজ। কাগজ রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য কাগজকে প্রকার ও গ্রেডে পৃথক করা প্রয়োজন। পুরনো কাগজকে প্রথমে ডি-ইংকিং বা কালি বিমোচন পদ্ধতি দ্বারা কাগজের কালি বিমুক্ত করা হয়। কালি বিমুক্ত কাগজকে পানিসহ chopped করা হয় এবং ঐ মিশ্রণকে উত্তাপ দেওয়া হয়। এতে লিগনিনের গঠন ভেঙে যায় এবং পাল্প তৈরি হয়। স্ক্রিন দ্বারা পাল্প থেকে আঠা অথবা প্লাস্টিক ও অন্যান্য পদার্থ আলাদা করা হয়। বিভাজিত করার পর পানিতে মেশানো হয় এবং পরে শুকানো হয়। আর এই পাল্প দিয়েই নতুন কাগজ তৈরি করা হয়ে থাকে।

কাগজ তৈরি হয় কাঠ থেকে। এক টন খবরের কাগজ রিসাইকেল করলে প্রায় এক টন কাঠ বেঁচে যাবে, প্রিন্টেড কাগজ রিসাইকেল করলে প্রায় দুই টন কাঠ সাশ্রয় হবে। কাগজ তৈরিতে যে পরিমাণ পানিদূষণ ঘটে, কাগজ রিসাইক্লিংয়ে অতটা ঘটে না। কাঠ থেকে কাগজ তৈরি করতে প্রচুর জ্বালানির খরচ হয়, কিন্তু রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে জ্বালানি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কম লাগে। নতুন কাগজ উত্পাদনের তুলনায় কাগজ রিসাইক্লিংয়ে পানিদূষণ ৩৫ শতাংশ এবং বায়ুদূষণ ৭৪ শতাংশ কম ঘটে। ইউরোপে ব্যবহূত কাগজের ৬০ শতাংশ রিসাইকেল হয়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজ প্রাকৃতিক সম্পদগুলো রক্ষা করে, শক্তি সঞ্চয় করে, গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস করে। এক টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজ ১৭টি গাছ, ৭,০০০ গ্যালন পানি, ৩৮০ গ্যালন তেল, ৩২ কিউবিক ইয়ার্ড ল্যান্ডফিল স্পেস এবং ৪,০০০ কিলোওয়াট শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছয় মাস ধরে বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে পারে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে পারে মেট্রিক টন কার্বন সমতুল্য (MTCE)।

মার্কিন পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার মতে, আমেরিকানরা প্রতি বছর ৮৫ মিলিয়ন টন পেপার এবং পেপারবোর্ড ব্যবহার করে এবং ফেলে দেওয়া কাগজের ৫০ শতাংশের বেশি পুনর্ব্যবহার করে।

বর্জ্য প্রবাহ হ্রাস করা ল্যান্ডফিলগুলোতে দ্রবীভূত উপাদানের মাধ্যমে মিথেন এবং অন্যান্য দূষক কমিয়ে দেয়। ইডিএফের মতে, মিথেন হলো এক শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস যা ওজোন স্তরটি হ্রাসের জন্য দায়ী; যা পৃথিবীকে সূর্যের রশ্মি থেকে রক্ষা করে।

গাছ কাগজ তৈরির জন্য ব্যবহূত কাঁচা পণ্যগুলোর এক তৃতীয়াংশ তৈরি করে। কাগজ তৈরিতে তাজা গাছের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করা কাগজ পুনর্ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।

পরিশেষে—লেখা ও ছাপার কাগজ না থাকলে শিক্ষা, শিল্প কারখানা, সরকারও অচল হয়ে পড়বে। পৃথিবীর প্রতিটি সভ্য দেশে কাগজের ব্যবহার রয়েছে। কাগজ ছাড়া সভ্যতাকে কল্পনা করা যায় না। কাগজ যেমন একটি সম্ভাবনাময় শিল্প, তেমনি নষ্ট বা অপচয়কৃত কাগজগুলোর রিসাইক্লিং কাগজশিল্পকে আরো প্রসারিত করবে। পাশাপাশি কমিয়ে আনবে কাঁচামাল প্রাপ্যতার চাপ এবং কাগজ উত্পাদনের খরচ। সেইসঙ্গে বনাঞ্চল রক্ষা পাবে।

শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ