তুলনামূলকভাবে ভালো আছি!

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২১, ২২:০০

ভালো থাকতে কে না চায়? কিন্তু সব সময় কি ভালো থাকা যায়? আমাদের জীবন প্রতিনিয়ত সংগ্রামমুখর। বেঁচে থাকার জন্য দোলনা থেকে কবর বা চিতা পর্যন্ত সকলকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়। সবসময় নানা রকম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে কখনো কখনো জীবনে খুব হতাশা কাজ করে। হতাশার কারণে শরীর ক্লান্ত লাগে, মনও ভালো থাকে না। আর নিজে ভালো না থাকলে অন্যকে ভালো রাখা যায় না। নিজেকে ভালো রাখা সম্ভবত জগতে সবচেয়ে কঠিন কাজ। জ্ঞানীরা বলেন, ভালো থাকা নির্ভর করে নিজের ওপর। আপনি গোটা দুনিয়ায় যে শান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, সেটা আসলে আছে আপনার নিজের ভেতরে। আকাঙ্ক্ষাকে কমিয়ে আনুন। অল্পতে তুষ্ট হওয়ার চেষ্টা করুন। যা পেয়েছেন, সেটাকে বড় করে দেখুন। যা পাননি, সেটা নিয়ে অনুশোচনা বন্ধ করুন। সব সময় হাসিখুশি থাকুন। কখনো কোনো বিষয় নিয়ে বিচলিত হবেন না, দুশ্চিন্তা করবেন না। জীবনে ভালো-মন্দ যা-ই আসুক সত্যকে সহজভাবে মেনে নিতে শিখুন।

এমন উপদেশ আমরা প্রতিনিয়ত শুনি। অন্যকেও দিই। কিন্তু সেটা কয় জন মেনে চলতে পারি? সবাই বলে দুশ্চিন্তা বা টেনশন করবেন না। আরে ভাই, দুশ্চিন্তাকে কি কেউ দাওয়াত করে আনে? ওটা এমনিতেই এসে যায়। কখন কী নিয়ে দুশ্চিন্তা আসবে তা কি কেউ আগেভাগে বলতে পারে? ঐ ভদ্রলোকের কথা আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন, যিনি ডাক্তারের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, ডাক্তার সাহেব, চিন্তায়-চিন্তায় আমার মাথার সব চুল উঠে গেল, আপনি শিগিগরই এর একটা বিহিত করুন। ডাক্তার বললেন, তা আপনি কী নিয়ে সারা ক্ষণ এমন চিন্তা করেন?

ভদ্রলোক বললেন, চুল উঠে যাওয়ার চিন্তায়! আসলে টেনশান বা দুশ্চিন্তা আসবেই, যাপিত জীবনে হতাশা-নিরাশা-আমাশাও আসতে পারে। তাতে চুল পড়াও অমূলক নয়। আর চুল পড়ার চিন্তাতে আরো বেশি চুল পড়তে পারে—সেটাও সম্ভব। তবে যথাসম্ভব আমাদের দুশ্চিন্তা কমাতে হবে। না হলে শুধু চুল পড়া নয়, আরো নানা রোগব্যাধি আমাদের গ্রাস করতে পারে। অকালে পটল তুলতেও হতে পারে।

আসলে আমাদের জীবনটা বড়ই গোলমেলে। জীবনের ঘটনাপ্রবাহ, বিভিন্নজনের কথাবার্তা—সেগুলোও

অনেক গোলমেলে। এখন কেমন বোধ করছেন—এ প্রশ্নের জবাবে এক ডাক্তার সাহেবকে রোগী জানিয়েছিলেন, এমনিতে কোনো কষ্ট আর নেই। শুধু নিশ্বাসের সময় বড় কষ্ট পাচ্ছি। এর জবাবে ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন, এ নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। ও আমি শিগিগরই বন্ধ করে দেব। এই গোলমেলে প্রবোধ বাক্যে রোগী কতটা নিশ্চিত হয়েছিলেন, বলা কঠিন। শিগিগরই নিশ্বাসের কষ্ট বন্ধ হয়ে যাবে—এ আশ্বাসে তিনি নিশ্চয়ই ভাবিত হয়েছিলেন। আসলে কার কোন কথা বা কোন ঘটনা যে রসিকতার খোরাক হবে, তা আগেই বলা যায় না। আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত অনেক ঘটনাই ঘটে, যা রসিকতার খোরাক হয়। কিন্তু সবাই সব সময় তা টের পায় না। এজন্য অবশ্য রসিক মন বা রসিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। জিনিসপত্রের দামের কথাই ধরা যাক। এই দাম বাড়ার ফলে আমাদের যে শুধু দুর্ভোগ-দুর্দশাই বাড়ছে, তা কিন্তু নয়। আমাদের অনেক উপকারও হচ্ছে। কিন্তু সে উপকারের খবর আর কে রাখে?

মধ্যবিত্তরা জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যের কারণে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে। অনেককে বড়লোকি ও ঠাঁট বজায় রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে—এসবই সত্যি কথা। কিন্তু এর মধ্যেও যে কল্যাণ আছে, তা আমরা কেউ তলিয়ে দেখছি না। মজার ব্যাপার হলো, এতে অনেকেরই ‘বিপরীতে হিত’ (হিতে বিপরীত নয়) হচ্ছে। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বলা যাক। এক রোগী তার রক্তে অধিক কোলস্টেরল-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। বেশ কিছুকাল চিকিত্সার পর রোগীর রক্তে কোলস্টেরল কমে যায়। এরপর রোগী ডাক্তার সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। জবাবে বিজ্ঞ ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন, আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে লাভ নেই। এ ব্যাপারে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। আপনি বরং সরকার বাহাদুরকে ধন্যবাদ দিন। সদাশয় সরকারের কৃপায় জিনিসপত্রের দাম আগুন হয়েছে। এ অগ্নিমূল্যের জন্য আপনি আগের মতো তেল, ঘি, মাখন, মাছ, মাংস, ডিম বেশি বেশি কিনে খেতে পারছেন না। তাই স্বাভাবিকভাবেই আপনার শরীরে কোলস্টেরলের মাত্রা কমে গেছে।

অগ্নিমূল্যের সূত্রে এবার একটি গোলমেলে বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বর্তমান যুগ হচ্ছে বিজ্ঞাপনের যুগ, প্রচারেই প্রসারের যুগ। বর্তমানে অভিনব ভাষায় বিচিত্র সব বিজ্ঞাপন দেখা যায়। এক দোকানের বাইরের সাইনবোর্ডে নিচের বিজ্ঞাপনটি দেওয়া ছিল: ‘তুলনামূলকভাবে কম দামে জিনিসপত্র কিনুন’। সাধারণত এ ধরনের বিজ্ঞাপন নিয়ে বিশেষ কেউ মাথা ঘামায় না। অত সময়ই বা কার আছে? কিন্তু দুনিয়ায় চিন্তাশীল ভাবুক লোক এখনো একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তেমনি একজন চিন্তাশীল খদ্দের জানতে চেয়েছিলেন, ‘কীসের সঙ্গে তুলনামূলক কম দাম?’ চতুর দোকানদার অত্যন্ত গম্ভীরভাবে জবাব দিয়েছিলেন, আগামী সপ্তাহের দামের সঙ্গে। বাজারদর প্রতিদিন যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তাতে প্রত্যেক জিনিসের দাম আগামীকালের চেয়ে বা আগামী সপ্তাহের চেয়ে আজকে সস্তা বৈকি! এ ধরনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ সম্প্রতি আরো এক ব্যক্তির মুখে শুনেছি। সব সময় সিরিয়াস এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে সেদিন ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞাসা করাতে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, খুব ভালো আছি। তার এ দৃঢ়তাপূর্ণ জবাব শোনার পর শুধিয়েছিলাম, চারদিকের যা পরিস্থিতি, তাতে এত ভালো থাকেন কী করে? তিনি আমাকে বিস্মিত করে জবাব দিয়েছিলেন, বলতে পারেন তুলনামূলকভাবে। আমি বাধ্য হয়ে বলেছিলাম, মানে? ভদ্রলোকের জবাব, গতকালের তুলনায় অবশ্যই খারাপ আছি, কিন্তু ভালো আছি আগামীকালের তুলনায়। দিন দিন সত্যি সময় খারাপ হচ্ছে, আগামীকালের তুলনায় আমরা সবাই ভালো আছি। কথাটা একটু গোলমেলে হলেও সত্য। ভবিষ্যতের শঙ্কা আমাদের দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা সবাই যে বর্তমান আগামীকালের চেয়ে আজ তুলনামূলকভাবে ভালো আছি—তা অস্বীকার করার উপায় কি?

পুনশ্চ: দ্রব্যমূল্য প্রসঙ্গে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে একটি কথপোকথন মনে পড়ল। একই পণ্যের দাম বিভিন্ন বাজারে বা দোকানে বিভিন্ন রকম। শাকসবজির কথাই ধরা যাক। রাজধানীর পাইকারি বাজারে শাকসবজিসহ বেশির ভাগ নিত্যপণ্য প্রায় একই দামে বিক্রি হয়। তবে পাইকারি থেকে বের হয়েই বাজারভেদে তা ১০ থেকে ২৫ টাকা এমনকি দ্বিগুণ হয়ে যায়। কাওরান বাজারে যে সবজি ২৫-৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়, সেটা মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে বিক্রি হয় ৪০ টাকায়। হাতিরপুল বাজারে একই সবজির দাম ৫০ টাকা, খিলগাঁওয়ে তা ৫৫ টাকা। মোহাম্মদপুরের টাউন হলে এসে তা হয়ে যায় ৬০ টাকা।

এক ব্যবসায়ীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি একটি ব্যাখ্য দেন। তার মতে, একই পণ্যের বিভিন্ন ধরনের দামের পেছনে ‘গুণগত মান’-এর ব্যাপার কাজ করে। জিনিস দেখতে এক রকম হলেই তা আসলে এক নয়। এর রকমফের থাকে। তার মতে, সব সময় সস্তা খুঁজলে খারাপ কিছুও জুটতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি একটি গল্প শোনান। এক চায়ের স্টলে একটা বোর্ডে লেখা আছে: ১. খানদানি চা ৩০ টাকা; ২. স্পেশাল চা ১৫ টাকা; ৩. সাধারণ চা পাঁচ টাকা;

এক ভদ্রলোক স্টলবয়কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, এই পাঁচ, ১৫ ও ৩০ টাকার চায়ের মাজেজাটা কী? বয় বলল, সব আসলে একই রকম, আপনার যেটা পছন্দ হয় খেয়ে নিন। ভদ্রলোক ভেবে দেখলেন, সব যদি একই হয়, তাহলে আর বাড়তি টাকা গুনে কী লাভ? তাই তিনি পাঁচ টাকা দামের একটা চা দিতে বললেন।

চা খেয়ে ভদ্রলোকের বেশ ভালো লাগল। তিনি বয়কে ডেকে চায়ের দাম পাঁচ টাকা এবং টিপস বাবদ এক টাকা দিয়ে বললেন, তোমাদের পাঁচ টাকার চা তো বেশ ভালোই লাগল। ৩০ টাকা দামের চা নিশ্চয়ই এর চেয়ে অনেক ভালো হবে। তা ঐ চা কি দিয়ে বানাও? বয় বলল, ৩০ টাকা দামের চায়ে আমরা খাঁটি দুধ ঘন করে জ্বাল দিয়ে দামি চায়ের পাতা আর মোটা দানার লাল চিনি ব্যবহার করি। ১৫ টাকার চায়ে ৩০ টাকা দামের চা থেকে বেঁচে যাওয়া চা পাতা, পানি মেশানো দুধ আর কম দামি চিনি ব্যবহার করি। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে পাঁচ টাকা দামের চা কি দিয়ে তৈরি কর? বয় বলল, ব্যাপারটা কি জানেন, ৩০ বা ১৫ টাকা দামের চা শুধু অভিজাত বড়লোকেরাই খায়। এরা ফ্যাশন করে পুরোটা চা খায় না, কাপে বেশ খানিকটা চা রেখে দেয়। আমরা সে উচ্ছিষ্ট চা একটা ফ্লাস্কে জমিয়ে রাখি এবং সেটাই গরম করে পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করে দেই!

n লেখক :রম্য রচয়িতা