বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বড় বেনিফিশিয়ারি বিএনপি ও জেনারেল জিয়া

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২১, ২২:২৯

বিএনপি ও জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় বেনিফিসিয়ারি উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এটি স্পষ্ট যে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মূল বেনিফিসিয়ারি বিএনপি তথা মেজর জিয়া। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের সাক্ষ্য, দলিলপত্র, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন লেখনি, বিভিন্ন গোপনীয় প্রতিবেদন প্রমাণ করে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডে জেনারেল জিয়ার সম্পৃক্ততা। মুখে অস্বীকার করলেও কোনোভাবেই এই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাত্কারে তিনি  এসব কথা বলেন।

সেতুমন্ত্রী বলেন, হাতের তালু দিয়ে যেমন আকাশ ঢাকা যায় না, তেমনি বিএনপি ও জেনারেল জিয়াও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারে না। শুধু ’৭৫-এর নির্মমতাই নয়, বিএনপি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে হত্যা করার জন্য গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে ২১ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর রক্তে রঞ্জিত বিএনপির হাত। তারা খুনের রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করছে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বসভার বিস্ময়। এখন আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা। মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে আগামীর বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে আর্থসামাজিক প্রায় প্রতিটি সূচকে আমরা পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে এসেছি। অনেক সূচকে ভারতের চেয়েও এগিয়ে বাংলাদেশ। এ এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনা ম্যাজিক।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, দেশে বর্তমানে উন্নয়নবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। তবে এর মধ্যেও একটি মহল দেশের চলমান অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এ মহল শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বিদেশেও নানান ষড়যন্ত্র করছে। গুজব আর অপপ্রচার চালাচ্ছে।

বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো পুরোনো এবং মীমাংসিত ইস্যু নিয়ে বিএনপি পালি ঘোলা করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে উচ্চ আদালত মিউজিয়ামে পাঠিয়েছে। এ নিয়ে পানি ঘোলা করার কোনো সুযোগ নেই। পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেভাবেই যথাসময়ে সংবিধানসম্মতভাবে দেশে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা বিএনপিকে বলব, একটি ক্রেডিবল নির্বাচন অনুষ্ঠানে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনে আমাদের আরো কাজ করার সুযোগ আছে। এ লক্ষ্যে বিএনপিরও ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি।

সরকারের করোনার সংকটজনক পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা এবং সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, করোনার শুরু থেকেই শেখ হাসিনা সরকার জনগণের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষায় ভারসাম্যমূলক কৌশল গ্রহণ করে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পাশাপাশি প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করে। কয়েক দফা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। অসহায়, দরিদ্র, কর্মহীন মানুষের সুরক্ষায় খাদ্য-সহায়তার পাশাপাশি নগদ সহায়তা অব্যাহত রাখে।

বিএনপির রাজপথের আন্দোলনের হুমকি এবং তাদের সামর্থ্য প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি রাজপথে আন্দোলনের হুমকিধমকি বিগত এক যুগ ধরে দিয়ে আসছে। তাদের আন্দোলন আষাঢ়ের গর্জন-তর্জন সার। বাস্তবে রাজপথে ততটা বর্ষে না। যারা নিজ দলের নেত্রীর জন্য রাজপথে একটি মিছিল করতে পারে না, তাদের সরকার বিরোধী আন্দোলনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। নেতিবাচক ও হঠকারী রাজনীতির জন্য বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন এবং হতাশাগ্রস্ত এক রাজনৈতিক দল। তাদের রাজনৈতিক সক্ষমতা শুধু বাক্যবাণে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে তাদের শক্তি এখন ক্ষয়িষ্ণু।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশে দুই ধারার রাজনীতি চলছে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার রাজনীতি, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার উন্নয়ন বিমুখ রাজনীতি। তবে আগামীর রাজনীতির ইস্যুই হবে উন্নয়ন এবং সুশাসন। যারা উন্নয়নের ধারা থেকে দেশকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়, তারাই জনগণের মন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের ভৌগোলিক মুক্তির রোল-মডেল, আর তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির রোল মডেল। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুঁচিয়ে আজ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত। আর্থসামাজিক প্রায় প্রতিটি সূচকে অর্জন করেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য।

বাংলাদেশে চলমান অনেকগুলো মেগা প্রকল্প সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, দেশে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের সাহস ও সক্ষমতা একমাত্র বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাই রাখেন, সেটা তিনি প্রমাণ করেছেন। এগিয়ে চলেছে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পের কাজ। পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। মেট্রোরেল ইতিমধ্যে ট্রায়ালরান সম্পন্ন করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেল রুট নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এদিকে দেশের প্রথম টানেল ও  এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজও এগিয়ে চলেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনীতিতে নানা মত ও পথ থাকতে পারে। থাকাটাই স্বাভাবিক। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভিন্ন কিছু বিষয়ে ঐকমত্য থাকা জরুরি। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা জরুরি। রাজনীতিতে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে আমাদের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তৈরি করার অপচেষ্টা হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। বিভেদের এই দেওয়াল আমাদের ভাঙতে হবে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমাদের আছে বিশাল জনগোষ্ঠী। সঠিক পরিকল্পনায় এই জনগোষ্ঠীকে আমরা জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারি। ইতিমধ্যে প্রণীত হয়েছে ভিশন-২০৪১ ও ডেলটা প্ল্যান। তারুণ্যের শক্তিকে প্রযুক্তির আলোয় বিকশিত করে সম্ভাবনার নবদ্বার উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র, মেধাবী কম্পিউটার বিজ্ঞানী সজীব ওয়াজেদ জয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ, ইনশাআল্লাহ। ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধ বাংলাদেশে উন্নীত হবে। বাস্তবায়িত হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।

দল ও সরকারের আলাদা অস্তিত্ব না থাকলে দলেরই ক্ষতি হয় উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, দল ও সরকার আলাদা অস্তিত্ব। আমরা দলকে সরকারের সঙ্গে মিশে যেতে দিতে পারি না। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সমান্তরালে জনকল্যাণে কাজ করছে। আপনারা দেখেছেন, এই মেয়াদে সরকার গঠনের পর আমাদের সভাপতি অনেক সিনিয়র নেতাকে সরকারে দায়িত্ব না দিয়ে দলে দায়িত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের সময়কালে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের পথ উন্মুক্ত হয়। এতে রাজনীতি হারিয়েছে নিজস্ব গতিপথ।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরো বলেন, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। ক্ষমতাকে নিজ ভাগ্যবদলের হাতিয়ার বানাতে দেননি। দলের যত বড় নেতাই হোক, অনিয়মের অভিযোগ এলে কাউকে বাঁচাননি। দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে সরকারের কোনোরূপ হস্তক্ষেপ ছাড়া। ক্ষমতায় থাকাকালে দলের অনেক জনপ্রতিনিধি, বিশেষ করে সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে, অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন, কেউ কেউ সাজা ভোগ করছেন। অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট তা তিনি প্রমাণ করেছেন।