আমাদের দেশে গ্রামীণ খেলাগুলোয় ঐতিহ্য রয়েছে, নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে, প্রতিটি খেলার পেছনে রয়েছে রংবেরঙের গল্প, সহস্র বছরের চর্চা, বাঙালির জাতীয় চরিত্র ও কৃষ্টি, সৃজনশীলতা এমনকি শিক্ষা লাভেরও ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েক বছর আগেও শহরসহ গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো; যেখানে দেশীয় খেলাগুলোর প্রতিই মনোযোগ দেওয়া হতো বেশি বিদেশি খেলাগুলোর চেয়ে, যা আর এখন সেভাবে চোখে পড়ে না। বাঙালিরা শারীরিক সুস্থতা ও খেলাধুলার যোগসূত্রকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এই বিচ্ছেদ কখনো সমাজের মানুষের জন্য আশীর্বাদ বা সুখকর হতে পারে না। শহরাঞ্চলে তাক তাক করে দালান গড়ে স্কুল বানানো হচ্ছে, শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ নেই। সরকারের সম্মতি নিয়েই সেই স্কুল দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে; কিন্তু খেলার মাঠহীন বদ্ধ পরিবেশের একটি স্কুলে শিশুদের মানসিক বিকাশের চেয়ে যে মানসিক হতাশা ও অনাস্থার জন্ম নেবে তা কেউ ভেবে দেখেনি। অনেক স্কুলে খেলার জন্য স্পোর্টস রুম ও শরীর চর্চার জন্য জিমনেশিয়াম থাকলেও তাতে যারা যেতে পারে তাদেরকেও মেনে চলতে হয় কড়া নিয়ম। বাসায়, ক্লাসে এবং অনুষ্ঠানে এ দেশের শিশু-কিশোরকে সবসময় নিয়মে বেঁধে রাখা হয়; শিশুদের নিজেকে উন্মোচন করতে পারার ক্ষমতা, নিজের মতামত ও নিজের চ্যালেঞ্জ নিজে নিতে পারা, কিছুটা নিয়মের বাইরে থাকা, মুক্ত পরিবেশের আস্বাদন এসব চার দেওয়ালের ভেতরে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ ও সুস্থতায় উন্মুক্ত পরিবেশ তথা খেলার মাঠের কোনো বিকল্প নেই।

আবহমানকাল জুড়ে বাংলার গ্রামগঞ্জে বিচিত্র সব খেলা মানুষের মনোরঞ্জনের উৎস ছিল। খেলা জুড়ে চলত উত্সব, চারদিকে অসংখ্য মানুষের ভিড়; খেলার মূল আকর্ষণ ছিল সেসব উৎসুক জনতা। যারা দাঁড়িয়ে কিংবা বসে খেলায় উৎসাহ দিত, বিপরীত পক্ষের সাপোর্টাররা নিজের দলকে উৎসাহ দিতে নানান শ্লোক গাইত, সেখানেও ছিল এক ধরনের সৃজনশীলতা, অদ্ভুত এক শিল্প। গ্রামীণ খেলাগুলো তখনকার মানুষের জন্য শরীরচর্চা ও চিত্তবিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় একটি মাধ্যম ছিল। বউচি, কানামাছি, গোল্লাছুট, ওপেনটি বায়োস্কোপ, এলাডিং বেলাডিং, লুডু খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, মার্বেল খেলা, মোরগযুদ্ধ, বালিশ বদল, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, লাটিম ঘোরানো, হাডুডু, পুতুল খেলা, কড়ি খেলা, টোপা ভাতি, ডাং-গুলি, দাঁড়িয়াবান্ধা, পুকুরে সাঁতার প্রতিযোগিতা, ষোলগুটি, এক্কা-দোক্কা, রুমাল চুরি ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন খেলায় রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নিয়মের বাহার যা ব্যক্তিত্ব ভেদেও ভিন্নরকম; যেমন—কিছু খেলা ডানপিটে, চঞ্চল কিশোরদের জন্য; কিছু কিছু মেয়েদের, কিছু খেলা ডাঙ্গায় তো কিছু পানিতে, কোনোটায় ছেলে মেয়ে উভয় খেলতে পারে, কিছু খেলা যুবকদের; স্তরে স্তরে গচ্ছিত এই খেলাগুলোর উপকরণও বেশ সহজলভ্য। আধুনিক খেলনাগুলোর মতো দুর্বোধ্য, ব্যয়সাধ্য ও দুর্লভ নয়। কাদা, মাটি, লাঠি, বাঁশ, ইট, কড়ি, গাছের পাতা, ফলের বীজ, ফুল, কাঠ, পাথর, পোড়া মাটির ভাঙা অংশ আর গোলাকৃতির বল থাকলেই অধিকাংশ খেলায় অংশ নেওয়া সম্ভব।
গ্রামীণ খেলা বাঙালির গৌরব ও ঐতিহ্যের বিষয়। প্রত্যেক প্রজন্মের কাছে এই সংস্কৃতির বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। শরীরচর্চায় সহায়ক গ্রামীণ খেলাগুলোর চর্চা এবং অভ্যাসে পরিণত করতে শিশু-কিশোরদের চেয়ে এগিয়ে আসতে হবে অভিভাবকদের। শিশুর প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাকে গর্বের বিষয় না ভেবে তা নির্দিষ্ট বয়সে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা উচিত। চীনে বাচ্চাদের গেমের আসক্তি রোধকল্পে—শুক্র, শনি ও রবিবার রাত ৮টা থেকে ৯টা—একঘণ্টা আর ছুটির দিনে ঘণ্টাখানেক খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আমাদের শিশুদের ডিজিটাল পর্দার আসক্তি থেকে মুক্তি দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
ইত্তেফাক/কেকে
