জেনে নিই কমনওয়েলথ স্কলারশিপের আবেদনের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া (দ্বিতীয়পর্ব)

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২১, ১৯:৪৫

ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। তিনি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ অর্জন করেছেন দু’বার। ২০০৯ সালে মাস্টার্স কোর্স সম্পন্ন করতে শাবিপ্রবির প্রথম কোনো গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়ে ইংল্যান্ডের লিডস মেটের স্কুল অব এপ্লাইড গ্লোবাল ইথিক্স এর পিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে মেরিটসহ মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। পরে ২০১২ সালে আবারো কমনওয়েলথ স্কলারশিপ অর্জন করেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ এর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পিএইচডি গবেষণার জন্য। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে ২০২২ সালের জন্য কমনওয়েলথ বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ইউজিসি। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এ বৃত্তি নিয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করতে পারবেন। আগামী ১৪ অক্টোবরের মধ্যে ইউজিসি বরাবর আবেদন করতে হবে। আজ তাঁর কাছে আমরা জানবো এ বছরের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ সম্পর্কে সাক্ষাত্কারের দ্বিতীয় পর্ব। 

বাংলাদেশী মেধাবীদের আবেদনের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া কী এবং এ বছর আবেদনের শেষ সীমা কবে?

 

ইতোমধ্যে ২০২২ সালের জন্য কমনওয়েলথ বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ইউজিসি। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা এ বৃত্তি নিয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করতে পারবেন। আগামী ১৪ অক্টোবরের মধ্যে ইউজিসি বরাবর আবেদন করতে হবে। ইউজিসির ওয়েবসাইট থেকে আবেদন ফরমটি ডাউনলোড করে তা পূরণ করে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, প্রকাশনার কপি, আইএলটিএস করা থাকলে তার সনদ, যুক্তরাজ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অফার লেটার থাকলে সেটা সংযুক্ত করে তা কমিশন বরাবর ডাক বা কুরিয়ার বা সরাসরি জমা দিতে হবে। আবেদনপত্র পূরণ করা খুবই সহজ। চাকুরীরত প্রার্থীরা অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকেই প্রাথমিক নির্বাচিত প্রার্থীদের সাক্ষাত্কারের জন্য ডাকা হতে পারে। ইউজিসির চেয়ারম্যান, সদস্যবৃন্দ, দেশের প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ ও সিনিয়র অধ্যাপকদের নিয়ে গঠিত নির্বাচনি বোর্ড প্রতিটি সাবজেক্ট গ্রুপ থেকে ১ বা ২জন প্রার্থী প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করে তাদের সিএসসির ওয়েবসাইট থেকে আবেদনপত্র ডাউনলোড করে তা পূরণ করে ইউজিসিতে জমা দিতে বলবে। ইউজিসি আবেদনপত্র যাচাইবাছাই করে তা লন্ডনের সিএসসিতে পাঠিয়ে দেয়। আর সিএসসি বাকী কাজগুলো সম্পন্ন করে। তবে একাডেমিক স্টাফ স্কলারশিপের জন্য প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষকদের মধ্য থেকে নমিনেশন দিয়ে সরাসরি ইউজিসিতে প্রেরণ করেন। সেখান থেকে ইউজিসি ১০ জন প্রার্থী নির্বাচন করেন।

 

আইইএলটিএস না থাকলে কি আবেদন করা যাবে বা আইইএলটিএসের ন্যূনতম স্কোর কত থাকতে হয়?

 

ড. জহিরুল হক: আইইএলটিএস স্কোর কিন্তু আবেদনের পূর্বশর্ত নয়। আবেদনপত্রে আপনি দেখবেন ‘আইইএলটিএস স্কোর যদি থাকে’ লিখা রয়েছে। তবে ইউজিসি প্রাথমিক নির্বাচিত প্রার্থীদের সাক্ষাতকার যেহেতু ইংরেজি মাধ্যমে নিবে সেহেতু ইংরেজিতে আবেদনকারীদের অবশ্যই দক্ষ হতে হবে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যেহেতু এটি তীব্র প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ সেহেতু যদি একজন প্রার্থীর আইইএলটিএসে ভালো স্কোর থাকে তাহলে নির্বাচনি বোর্ড যাদের আইইএলটিএস স্কোর নেই বা কম স্কোর তার চেয়ে তাদের বেশি প্রাধান্য দিবে। আইইএলটিএস স্কোর ছাড়া যদি কোনো প্রার্থী ইউজিসির নমিনেশন পেয়েও যান তাহলে ১/২ মাস তথা লন্ডনের সিএসসি এর সিলেকশন শুরু হওয়ার পূর্বেই তাকে আইইএলটিএসের স্কোর জমা দিতে হবে। সেক্ষেত্রে নূন্যতম স্কোর হলো ৬.৫। তবে সেটা নির্ভর করে  বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামে ভর্তির নূন্যতম আইইএলটিএস স্কোরের উপর। উদাহরণস্বরূপ কোনো প্রার্থী যদি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চায় তাহলে তার আইইএলটিএস স্কোর ৭ এর উপর থাকতে হবে। আবার কোনো প্রার্থী যদি স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হতে চায় তাহলে তার আইইএলটিএস নূন্যতম স্কোর ৭.৫ থাকতে হবে।

কমনওয়েলথ স্কলারশিপের প্রাথমিক আবেদনের সময় যুক্তরাজ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন বা এডমিশনের অফার লেটার কি থাকতে হবে?

ড. জহিরুল হক: মূলতঃ কমনওয়েলথ স্কলারশিপের প্রাথমিক আবেদনের সময় যুক্তরাজ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন বা এডমিশনের অফার লেটার থাকতে হয় না। আবেদনপত্রে এমন একটি কলাম রয়েছে। তবে সেখানে উল্লেখ আছে ‘যদি থাকে’। সেক্ষেত্রে যদি কারো যুক্তরাজ্যের ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থাকে বা আনকন্ডিশনাল অফার লেটার থাকে তাহলে সেটি প্রার্থীর একটি বাড়তি যোগ্যতা। সেক্ষেত্রে নির্বাচনি বোর্ডের সদস্যরা যাদের সেই অফার লেটার বা ভর্তি নেই তাদের চেয়ে যাদের ভর্তি বা অফার লেটার রয়েছে তাদের অগ্রাধিকার দিবেন সেটিই স্বাভাবিক। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশনও মনে করে যাদের এডমিশন রয়েছে তাদেরকে স্কলারশিপ দিলে অন্ততঃ তার স্কলারশিপ বাতিল হবে না। আমার জানা মতে অনেকেই ইউজিসির নমিনেশন পেয়েও পরে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশনের লিস্টেড কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন নিশ্চিত করতে না পারায় পরে তাদের স্কলারশিপ বাতিল হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিন্তু বিরাট ক্ষতি হয়ে গেলো। তাই ইউজিসিও চায় তাদের নির্বাচিত প্রার্থী অবশ্যই যাতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়। এতে ইউজিসির মর্যাদার ব্যাপারটিও জড়িত। তবে ইউজিসির মনোনয়ন পাওয়ার পর সিএসসির আবেদন পত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করতে হয়। সিএসসি সে মোতাবেক প্রার্থীদের কাগজপত্র তাদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করে ভর্তির কনফার্মেশনের অপেক্ষা করে। কনফার্মেশন পেলেই পরবর্তী পর্যায় শুরু হয়। সেক্ষেত্রে কোনো প্রার্থী যদি ভর্তির কনফার্মেশন লেটার দিয়ে দেয় তাহলে সেটি অবশ্যই প্রার্থীর একটি বাড়তি যোগ্যতা। সেটি ইউজিসির বিশেষজ্ঞ বোর্ডকেও ইমপ্রেস করতে সহায়তা করে।

 

কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য চূড়ান্ত নির্বাচিতরা কি কি সুবিধা পেয়ে থাকেন?

 

ড. জহিরুল হক: দেখুন আমি পূর্বেই বলেছি এটি বিশ্বের সম্মানজনক স্কলারশিপগুলোর মধ্যে একটি। আর কমনওয়েলথ এর প্রধান হচ্ছেন ব্রিটিশ রানী। যারা এ বৃত্তি পান তারা মহামান্য রানীর অতিথি হিসেবেই যুক্তরাজ্যে গমন করেন। সে সম্মান তো অর্থ দিয়ে মূল্যায়িত করা যায় না। তারপরও কমনওয়েলথ স্কলারশিপের আর্থিক সুবিধা উল্লেখ করার মতো। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশন নির্বাচিত স্কলারদের যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদয় টিউশন ফি, প্রার্থীর ইউকে ভিসা ফি, মেডিক্যাল ফি, বাংলাদেশের প্রার্থীর নিকটবর্তী এয়ারপোর্ট থেকে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী এয়ারপোর্ট পর্যন্ত রিটার্ণ এয়ার টিকেট, লন্ডনের বাইরে থাকলে মাসিক ভাতা হিসেবে দেওয়া হয় ১ হাজার ৮৬ পাউন্ড। লন্ডনের ভেতরে থাকলে ভাতার পরিমাণ ১ হাজার ৩৩০ পাউন্ড। মাসিক ভাতার বাইরেও এককালিন ৪২১ পাউন্ড উষ্ণ পোষাকের জন্য, ‘স্টাডি ট্রাভেল গ্র্যান্ট’ হিসেবে ২০০ পাউন্ড, ‘থিসিস গ্র্যান্ট হিসেবে দেওয়া হয় ২২৫ পাউন্ড, কমনওয়েলথ কমিশন কর্তৃক আয়োজিত যেকোনো প্রশিক্ষণ, স্বল্পমেয়াদি কোর্স, ওয়েলকাম ইভেন্ট ও আঞ্চলিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য ট্রেনের টিকিট, থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা, সাথে স্পাউস ও সন্তান নিয়ে গেলে তাদের মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। এছাড়া পিএইচডির স্কলারদের ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য যাওয়া আসার বিমান টিকেট দিয়ে থাকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশন। তবে প্রতিবছরই নতুন নতুন সুবিধা যুক্ত হয়। এটি ২০১৭ সালের হ্যান্ডবুক থেকে নেওয়া। প্রতিবছরই মুদ্রাস্ফিতি ও জীবন-ধারণের ব্যয় বৃদ্ধি অনুযায়ী বৃত্তির পরিমাণ বেড়ে থাকে।