জীবনসংগ্রামে একটু কমা প্রয়োজন

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩৭

ছোটকালে পড়েছি, সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। শিক্ষকগণ নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে এই মহামূল্যবান বাণীর তাত্পর্য আমাদের বুঝিয়েছেন। আমরাও বুঝেছি সময় হেলার পাত্র নয়, তাকে অবহেলা করা চলবে না। তাই সেই ছোটকাল থেকেই আমরা পরতে পরতে সময়ের হিসাব নেওয়া শুরু করেছি। পাছে যেন তার অপব্যয় না হয়ে যায়। এই হিসাব করার ব্যাপারটি বা সময়ানুবর্তিতা নিঃসন্দেহে মানবজীবনের একটি মহত্ গুণ। তবে হিসাবের খাতায় সময়ের বণ্টন সুষম না হলে তখন লাভের থেকে ক্ষতির মাত্রাই বেশি হয়।

মানুষকে যেমন বাহ্যিকভাবে সমৃদ্ধ হতে হয়, তেমনি অর্জন করতে হয় আত্মিক পরিপুষ্টতা। আত্মিক পরিপুষ্টতা বা হূদয়কে সমৃদ্ধ করতে না পারলে জাগতিক কোনো মঙ্গল তার দ্বারা সম্ভব নয়। আত্মাকে পরিপূর্ণ করতে যেমন আত্মিক সাধনার প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটু অবসর, একটু বিরতির। এই অবসর মানুষের চিন্তার জগেক ঝাঁজালো করে; নিজেকে চিনতে শেখায়; নতুন ভাবোদয়ের জন্ম দেয়; অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করে। জীবনের তাগিদে চাকরি, ব্যবসা, অর্থকড়ি, ধনদৌলত ইত্যাদির পেছনে অনবরত ছুটতে গিয়ে কখনো আমাদের আত্মার সমৃদ্ধতা ক্ষয়ে যায়। তখন হতাশা-দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরে। রোগ-শোকে পেয়ে বসে। তাই প্রয়োজন আত্মিক প্রশস্ততা।  আর অবকাশই আত্মাকে সুস্থ করে তোলে, প্রশস্ততা দান করে। তবে সেই অবকাশের জন্য আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সময় বরাদ্দ আছে কি? 

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক। মানুষ কেন বেঁচে থাকে? জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই বা কী? এমন প্রশ্ন কোনো রাজদরবারের মণি-মুক্তাখচিত সিংহাসনের অধিপতির কাছে পেশ করা হলে তিনি জবাব দেবেন—জীবনের লক্ষ্য ক্ষণস্থায়ী ধরাধামে নিজের নামকে যুগ-যুগের জন্য স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে রেখে যাওয়া। আর ঐ রাজ্যের সর্বাপেক্ষা দরিদ্র মানুষটির কাছে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলবেন—জীবনের অর্থ দুবেলা দুমুঠো আহার জুগিয়ে কিছু উচ্ছিষ্ট জমিয়ে রাখা। এবার দরবারের কোনো আমলাকে একই প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেবেন—পদোন্নতি পেয়ে বর্তমান অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তাহলে একটি বিষয় পরিষ্কার হলো, রাজা থেকে প্রজা বা আমলা থেকে সাধারণ কর্মজীবী—সব মানুষের মধ্যে তার বর্তমান অবস্থান থেকে উন্নত হওয়ার একটি উচ্চতর আকাঙ্ক্ষা থাকে, বড় হওয়ার ইচ্ছা থাকে। এই ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তার জীবনের সব আয়োজন, যত জল্পনা-কল্পনা। তার সব শ্রম, শক্তি, মেধা ও সময় তিনি সঁপে দেন এই জল্পনার খায়েশ মেটাতে। তবে কেবল এই বড় হওয়ার ইচ্ছা ছাড়াও যে জীবনের আরো কিছু মৌলিক সত্য আছে, সৌন্দর্য আছে, তা ভুলে থাকেন অনেকেই। এখানেই ঘটে বিপত্তি। বড় হওয়ার তাগিদে আমরা অবিরাম ছুটতে শুরু করি। এই ছোটায় কোনো যতি নেই, ছেদ নেই বা বিরাম চিহ্ন নেই। আমাদের ছোটা শুরু হয় জন্ম থেকে, চলতে থাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। ছোটাছুটির রোষানলে পড়ে আমরা বঞ্চিত হই জীবনের ঐ সব সৌন্দর্য থেকে। আমরা নগদে বিশ্বাসী; বাকিতে নয়। অবকাশ ফল দেয় একটু দেরিতে। তাই এই সৌন্দর্যকেও ফেলে রেখেছি ঐ বঞ্চিত হওয়ার কাতারেই।

প্রশ্ন ছিল, অবকাশের জন্য আমাদের সময় বরাদ্দ আছে কি না। এতক্ষণে পাঠক তার উত্তর জেনে গেছেন, তা হলো—নেই। আমরা জয় করতে ভালোবাসি। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্বকে জয় করি; তবে নিজেকে নয়, আত্মাকে নয়। আত্মাকে জয় করার ভাবনা আমাদের মনস্তাত্ত্বিকতায় নেই। তবে এই জয় কঠিন কিছু নয়। একটু একান্তে নিরিবিলি সময়, একটি ভালো বই বা জ্যোত্স্নাস্নাত চাঁদের আলো কিংবা একটি ভালো গান বা ভালো নাটক দিয়েই পরিশীলিত করা সম্ভব আত্মাকে। কিন্তু সেই সময় আমাদের নেই। আগ্রাসনী সমাজ-সামাজিকতা, পারিপর্শ্বিকতা বোঝাতে থাকে অমন মেকি আমাদের জন্য নয়; আমাদের দৌড়াতে হবে কেবল অর্থ, ধনদৌলত, গাড়ি-বাড়ি, সাম্রাজ্য আর ক্ষমতার পিছনে; তবেই জয় করা সম্ভব হবে। এই মিছে ভাবনায় যেন আমরা বুঁদ হয়ে আছি। এই ভাবনার ইতি ঘটিয়ে জীবনসংগ্রামে একটু কমা প্রয়োজন, থামা প্রয়োজন।

n  লেখক : শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।