একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক ও বুয়েটের শিক্ষক ড. ইনামুল হক ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজেউন)। গতকাল সোমবার দুপুরে হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইনামুল হকের মৃত্যুতে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ইনামুল হকের বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। গুণী এই অভিনেতার পুরো পরিবার নাটকে সম্পৃক্ত। তার স্ত্রী লাকী ইনামও জনপ্রিয় অভিনেত্রী। মেয়ে হূদি হক নির্দেশক ও অভিনেত্রী। জামতা অভিনেতা লিটু আনাম। ড. ইনামুলের অপর মেয়ে পৈত্রি হকের স্বামী কৌতুক অভিনেতা সাজু খাদেম।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নাট্যাঙ্গনে ইনামুল হকের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রমুখ। এছাড়া শোক জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ এবং উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
জামাতা লিটু আনাম জানান, ‘ড. ইনামুল হক দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর চেয়ারে বসে ছিলেন। সে অবস্থাতেই তিনি চলে যান। তার পালস পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
পরে ইনামুল হকের মরদেহ হাসপাতাল থেকে শান্তিনগরে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে গোসলের জন্য নেওয়া হয়। সেখান থেকে তার বেইলি রোডের বাসায় নেওয়া হয়। এরপর বেইলি রোডে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, জাতীয় পার্টি-জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক সিদ্দিকী। এছাড়া অভিনয়জগতের কলাকুশলীরা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। শিল্পকলা একাডেমিতে মরদেহ আনার পর এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয় মানুষ, প্রিয় শিক্ষক ও প্রিয় অভিনেতাকে হারানোর বেদনায় অশ্রুসজল হয়ে পড়েন দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের আয়োজনে সন্ধ্যার এই শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্বে ইনামুল হকের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন নাট্যজন আতাউর রহমান, রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী লাকী, নাট্যজন নাসির উদ্দিন ইউসুফ, তারিক আনাম খান, অভিনেত্রী ও নির্দেশক সারা যাকের, অনন্ত হিরা, থিয়েটার আর্ট ইউনিটের চন্দন রেজা, মহকালের মীর জাহিদ, অনুবাদক ও নাট্যকার অধ্যাপক আবদুস সেলিম, অভিনেত্রী ত্রপা মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ প্রমুখ।
প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিকভাবে শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, জাসদ, আরণ্যক, থিয়েটার, প্রাচ্যনাট, দেশ নাটক, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
পরিবারের পক্ষে বক্তৃতা করেন স্ত্রী লাকী ইনাম ও মেয়ে হূদি হক।
এরপর মরদেহ রাখা হয় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের হিমঘরে। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় তার মরদেহ নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বুয়েট খেলার মাঠে জানাজা শেষে মিরপুরের শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে মৃত্যুর খবর পেয়ে ইনামুল হকের বেইলি রোডের বাসায় হাজির হন সহশিল্পীদের অনেকেই। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, কেরামত মওলা প্রমুখ।
ইনামুল হকের প্রয়াণে মর্মাহত মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমি একজন ভালো বন্ধুকে হারালাম। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনের অনেক স্মৃতি। এ দেশের নাট্যচর্চার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অনেক নিবিড়। রেখেছেন অসামান্য অবদান। উলটো দিকে মানুষ হিসেবেও ছিলেন সজ্জন। আমৃত্যু প্রগতিশীল চেতনা ধারণ করেছেন।’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘একে একে যেন বাতিগুলো নিভে যাচ্ছে। তার মধ্যে ড. ইনামুলের এই চলে যাওয়া একেবারেই আকস্মিক ও অনভিপ্রেত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের এক অগ্রণী মানুষ ছিলেন তিনি।’
ড. ইনামুল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৪৩ বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকার সময় দীর্ঘ ১৫ বছর রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান এবং দুই বছর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নটর ডেম কলেজে ছাত্র থাকার সময়ই তিনি প্রথম মঞ্চে অভিনয় করেন। ১৯৬৮ সালে বুয়েট ক্যাম্পাসেই ‘নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়’-এর যাত্রা শুরু হয়। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। এই দলের হয়ে প্রথম তিনি মঞ্চে অভিনয় করেন আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ নাটকে। এরপর এই দলের হয়ে ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’, ‘নূরলদীনের সারা জীবন’সহ আরো বহু নাটকে অভিনয় করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি এই দল থেকে বের হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন’। এই দলের হয়ে তিনি মঞ্চে অভিনয় করেন ‘জনতার রঙ্গশালা’, ‘সরমা’সহ আরো বেশ কয়েকটি নাটকে। ২০০০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন ইনস্টিটিউট অব ড্রামা’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। ইনামুল হকের মঞ্চের জন্য প্রথম লেখা নাটক হচ্ছে ‘বিবাহ উত্সব’। ইনামুল হক অভিনীত প্রথম টিভি নাটক মোস্তফা মনোয়ার পরিচালিত ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’। তার লেখা প্রথম টিভি নাটক ‘অনেক দিনের একদিন’ নির্মাণ করেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিটিভিতে প্রথম নাটক ‘বাংলা আমার’ এবং বিটিভিতে একুশের প্রথম নাটক ‘মালা একশত মালঞ্চের’ তারই লেখা। ইনামুল হক টেলিভিশনের জন্য ৬০টিরও বেশি নাটক লিখেছিলেন। ২০১২ সালে ড. ইনামুল হক একুশে পদক লাভ করেন। ২০১৭ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে সরকার।
ড. ইনামুল হকের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৯ মে ফেনী সদরের মটবী এলাকায়। তার বাবা ওবায়দুল হক ও মা রাজিয়া খাতুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে অনার্স ও এমএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। মানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ড. ইনামুল হক।
তার ১৮টি নাটক বিভিন্ন নাট্যপত্রে, বিশেষ ম্যাগাজিনে ও বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। ইনামুল হকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—নির্জন সৈকতে, গৃহবাসী, মুক্তিযুদ্ধ নাটকসমগ্র, মহাকালের ঘোড়সওয়ার, বাংলা আমার বাংলা ইত্যাদি।
