‘দেশের কল্যাণে কাজ করতে চাই’

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৭:৪৬

 

বাবার প্রথম মা তাই ডাক নাম প্রমা। পুরো নাম ফারজানা হানিফ প্রমা। দেশের বাড়ি চাঁদপুর। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে ঘোরা হয়েছে দেশের বেশ কিছু জেলায়, তারপর সাভারেই স্থায়ীভাবে বসবাস। ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছেন ক্যান্টনমেন্টে, স্কুল-কলেজ পাস করেছেন সাভার ক্যান্টনমেন্ট থেকেই।

ছোটবেলার একটা মজার অভিজ্ঞতা মনে করে বললেন, আগে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলেই মনে হতো অন্য শহরে এসেছি, কারণ ভিতরটা কি সুন্দর গোছানো, কোনো ময়লা নেই, ঠিক যেন ছবির মত আর বাইরে নানা সমস্যা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, এর একটাই কারণ ভিতরে নিয়ম মেনে চলে বাইরে আমরা মানি না।

কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি যুদ্ধ, ইচ্ছে ছিল সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ার, চান্সও পান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু শেষমেশ মায়ের ইচ্ছা না থাকায় আর পড়া হলো না। তারপর ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিক্যাল ফিজিক্স এন্ড বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। মেডিক্যাল ফিজিক্স বা চিকিত্সা পদার্থবিদ্যা হলো মেডিক্যালের কাজে ব্যবহূত ফলিত পদার্থবিজ্ঞান। যেখানে মূলত মানুষের রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ে পদার্থবিদ্যার জ্ঞান ও কৌশল ব্যবহার হয় আর বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের একটি বিভাগ যা চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান দেয়। বিষয়টা সম্পর্কে তখন তেমন মানুষের জানাশোনা ছিল না সেজন্যে বেগ পেতে হয়েছে কিছুটা কিন্তু হাল ছাড়েনি, ইচ্ছা ছিল একই বিষয়ের উপর দেশের বাইরে পড়াশোনা করার কারণ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে মেডিক্যাল ফিজিক্স কোর্স চালু হয় ২০০০ সালে। দেশে ক্যান্সার সচেতনতা যেভাবে বাড়ছে তার জন্য আমাদের দরকার পর্যাপ্ত ডাক্তারের পাশাপাশি চিকিত্সা পদার্থবিদ।

স্বপ্ন পূরণের জন্য ধাপে ধাপে এগোতে লাগলাম। অনার্সের শেষ সেমিস্টার থেকেই খোঁজ নিতে থাকলাম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, আবেদন করার প্রক্রিয়া কিন্তু মোটেই সহজ নয়। বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্ম পূরণ করাটাও পরীক্ষার মত, অনেক কাগজপত্র জমা দেওয়া লাগে, কিছু সার্টিফিকেট বিভিন্ন সরকারি কার্যালয় থেকে এটাস্ট করতে হয়।

উচ্চশিক্ষার জন্য দক্ষিণ কোরিয়াও খুব ভালো অপশন, কোনো অংশেই অন্যান্য উন্নত দেশগুলো থেকে পিছিয়ে নেই। কোরিয়াতে বছরে দুইটা সেমিস্টার স্প্রিং (মার্চ), ফল (সেপ্টেম্বর), স্কলারশিপের জন্য দু’ভাবে আবেদন করা যায় ১. ইউনিভার্সিটি তে ২. প্রফেসর ফান্ডিং।

ই-মেইল করার একটা ছোট্ট টিপস হলো ছুটির দিনের পরের দিন অর্থাত্ সোমবারে কোরিয়ান সময় ৮-৯টা মানে বাংলাদেশ সময় ভোর ৫-৬টা করলে দ্রুত রিপ্লাই পাবার সম্ভাবনা থাকে বেশি কারণ এতে করে প্রফেসর অফিসে এসেই আপনার মেইলটা পাবেন। 

এরপর ছিল অপেক্ষার পালা ভীষণ চিন্তায় কেটেছে সেদিনগুলো। তারপর হঠাত্ সুখবর আসলো এবং পছন্দের বিষয়ে চান্স পেয়ে গেলাম তাও আবার পূর্ণ বৃত্তিতে এবং প্রফেসর সহকারী গবেষক হিসেবে তার ল্যাবে কাজ করার সুযোগ। প্রমা দক্ষিণ কোরিয়ার কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োমেডিক্যাল সাইন্সে স্নাতকোত্তর করছেন। এবং রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট (আর এ) হিসেবে কাজ করছেন “ডিপ ব্রেন সিমুলেশন” নিয়ে। আর এই কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে দেশের কল্যাণে যতটা সম্ভব কাজ করতে চাই।

স্বপ্নের এই সিঁড়িতে পৌঁছানোর জন্য অনেকগুলো সিঁড়ি মাড়িয়ে আসতে হয়েছে। তার জন্য ধৈর্য আর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। আমার মনে হয় সবসময় জীবনের একটা লক্ষ্য ঠিক করা উচিত না, ২/৩ এর অধিক লক্ষ্য থাকা ভালো এতে হতাশা কম কাজ করে। সময় আর সুযোগের ভালো ব্যবহার করা যায় এর মাধ্যমে।

পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করতে পছন্দ করেন প্রমা। শখের বশে ক্রাফটিং করেন, নিজের একটা ফেসবুক গ্রুপও রয়েছে। এছাড়া গণবিশ্ববিদ্যালয়ে কালের কণ্ঠ শুভ উত্সবে ২০১৭ সালে উপস্থাপনা করে পেয়েছেন ব্যাপক খ্যাতি। বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন উপস্থাপনার জন্য প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন একদিন অনেক বড় হবে। দেশে থাকতে যোগ দিয়েছেন বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। স্কুল-কলেজে নাচ, কবিতা, অভিনয়ে পেয়েছেন নানা পুরস্কার। সমপ্রতি নভেম্বর ২০১৮তে অনুষ্ঠিত কোরিয়ান সোসাইটি অফ টক্সিকোজিওমিক্স অ্যান্ড টক্সিকোপ্রেটোমিক্সড এর ১৪তম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রমা সেরা পোস্টারের পুরস্কার পেয়েছেন।

ভবিষ্যতে নিজেকে একজন ভালো রিসার্চার হিসেবে দেখতে চাই। উচ্চশিক্ষা শেষে দেশের কল্যাণে কাজ করতে চাই, অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। আমার মনে হয় আমাদের দেশের নারীদের জড়তার মোড়ক ভেঙে বের হতে হবে। নারী মুক্তির প্রধান ও সর্বশেষ শর্ত হচ্ছে শিক্ষা। মুখে পরিবর্তন না করে কাজে পরিবর্তন করতে হবে। তাহলে দেশ একদিন বদলে যাবে। সময় পেলে ভালো লাগে কোথাও ঘুরতে যেতে, গল্পের বই পড়তে, রান্না করতে, বন্ধু-প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডা দিতে।