রেজাউল করিম খোকন
আজ অনেক বছর পর সৌরভকে দেখল মুনা। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে গাড়িতে বসে আছে মুনা, আর রাস্তার একপাশের ফুটপাত ধরে হাঁটছে সৌরভ। আজো সেই একইরকম হাঁটার ভঙ্গি, চুলের স্টাইলেও কোনো পরিবর্তন নেই। বয়স কিছুটা বাড়লেও আগের মতোই রয়েছে সবকিছু, তেমন কিছু বদলায়নি। মুনাদের বাসার ঠিক বিপরীত দিকের বাসাটা ছিল তাদের। রোজ বিকেলে সৌরভকে দেখতে ছাদে চলে যেত মুনা। তার প্রতি দুর্বলতার কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারেনি মুনা কোনোদিন। লজ্জা, সংকোচ আর ভয় সবসময় মুনাকে জড়িয়ে ধরত; সৌরভকে বলা হয়নি তাকে ভালো লাগার কথা। সৌরভকে দূর থেকে দেখেই তার মনে যেরকম তোলপাড় হয়, সামনাসামনি হলে কী যে হবে অবস্থা—ভাবতেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেত তার।
সৌরভের কবুতর পোষার শখ ছিল। বিকেলে সে তখন পোষা কবুতরগুলোকে খাওয়ানোয় ব্যস্ত থাকত, মুনা ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখত তাকে। রাস্তায় মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেত তাদের। মুনা কেন জানি মুখ তুলে তাকাতেই পারত না তার দিকে। কথা বলা তো দূরের বিষয়। ছাদে উঠে দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখার জন্য ছাদে যাওয়াটা নেশার মতো হয়েছিল তার। এজন্য কতবার যে বৃষ্টিতে ভিজেছে সে, তার হিসেব নেই। এমনও হয়েছে দিনের পর দিন মুনা ছাদে অপেক্ষা করেছে, কিন্তু সৌরভের দেখা পায়নি। মাঝে মাঝে বেশ রাত হয়ে যেত শুধু তাদের বাসার দিকে তাকিয়ে থেকেই।
অল্প কিছুদিন পর সৌরভের বাবা বদলি হলে গোটা পরিবারও পাবনা চলে যায়। এর পর মাস গড়িয়ে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। সৌরভের সঙ্গে দেখা হয়নি আর। আজ হঠাত্ এভাবে রাস্তায় তাকে দেখবে, ভাবতে পারেনি। মুনার ইচ্ছে করছিল, গাড়ি থেকে নেমে সৌরভের মুখোমুখি দাঁড়ায়। তাকে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছ তুমি, কী করছ এখন, তুমি কি জানতে? তুমি কি বুঝতে? সৌরভ, তুমি কি জানো, দিনের পর দিন একটি মেয়ে শুধু তোমাকে এক নজর দেখার আশায় কতোটা সময় ধরে অপেক্ষা করেছে।
মুনা গাড়িতে বসে সৌরভের হেঁটে যাওয়া দেখতে দেখতে হারিয়ে যায় কোন অতলে।
কিছুক্ষণের মধ্যে যানজট খুলে যায়। গাড়ি চলতে শুরু করে। ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকা সৌরভ মুনার দৃষ্টিসীমার আড়াল হয়ে গেছে ততক্ষণে। ঘাড় ঘুরিয়ে অস্থিরভাবে কিছুক্ষণ খুঁজে ফেরে মুনার চোখ।
