>> শাকিরুল আলম শাকিল
বৈচিত্র্যে ঘেরা সমুদ্র। অবারিত নীল জলরাশি কখনো ভয়ঙ্কর উত্তল, কখনো শীতল প্রশান্ত। সূর্যের প্রখর আলোয় ঝিকিমিকি করা জলে যখন ক্লান্তির রেখা ফুটে উঠে, তখন তিনি আনমনে গেয়ে উঠেন ‘ওরে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া...’। সেইসঙ্গে বেজে উঠে গলায় ঝোলানো ছোট্ট গিটারটি। গিটার আর গানের সুরের সুধাময় মিলন যেন ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়, স্নিগ্ধতা ছড়ায় সাগরের অথই জলে। এভাবে নিজের কর্মক্ষেত্রকে তিনি উপভোগ্য করে তুলেছেন নিজের ভালোলাগা কিছু গান দিয়ে। বলছিলাম একজন ভিন্ন ভাবনার মেরিন অফিসার মারুফের কথা।
মারুফ ছোট থেকেই গান গাইতে ভালোবাসেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো গান শেখা হয়নি বা নেওয়া হয়নি সংগীতের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দীক্ষা। ইচ্ছে ছিল নিজের প্রফেশনের পাশে গানকে নিবেন প্যাশন হিসাবে। বর্তমানে কর্মসূত্রে মারুফকে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে হয় সমুদ্রগামী জাহাজে। পাড়ি দিতে হয় বহু নদ-নদী, সমুদ্র, সাগর-মহাসাগর। এই দীর্ঘ সময়ে নিজের একাকিত্বকে ভুলে থাকতে সমুদ্রের নানা প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাঝে মধ্যে তিনি গান ধরেন। শখের বসে গাওয়া সেই গান শুনে বিমুগ্ধ হন সহকর্মীরা। কখনো কখনো নিজের গাওয়া এসব গান তিনি প্রকাশ করেন স্যোশাল মিডিয়ায়। সেখানেও ঋব্ধ হন অগনিত দর্শক-শ্রোতা। এ যেন এক ভিন্ন রকমের সৃষ্টি! শ্রোতাপ্রিয় গানগুলো সামুদ্রিক আবহাওয়ার মাঝে শুনতে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকে। কেউ আবার ম্যাসেজ বা কমেন্ট বক্সে নিজের প্রিয় গানটি সামুদ্রিক এই পরিবেশে গেয়ে শোনানের দাবি জানিয়ে বসেন।
গানের পাশাপাশি মারুফ মাঝে মধ্যে জাহাজের বিভিন্ন ক্রিয়া কৌশল ও ভিতরকার পরিবেশ নিয়ে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করেন। জাহাজ পরিচালনা, নোঙ্গর ফেলা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা তীব্র সামুদ্রিক ঝড়ের মধ্যে নাবিকদের লড়াই—কিছুই বাদ যায় না তার কনটেন্ট থেকে।
দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে মারুফ বলেন, ‘আমাদের এই প্রফেশন নিয়ে সাধারণ মানুষের একটা বড় আগ্রহ আছে। তারা জানতে চান আমরা কোথায় থাকি বা কী কাজ করি। তাই আমি চিন্তা করি জাহাজের মধ্যে আমাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম নিয়ে ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ তৈরি করার এবং সেগুলো স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করলে দর্শকদের দারুণ সাড়াও পেতে থাকি।’
মারুফের শৈশব-কৈশোর কেটেছে জন্মস্থান রাজশাহীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে মারুফ ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশলী বিভাগে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি সেই যাত্রা। ইচ্ছে জাগে ভিন্ন কিছু করার। সেই ইচ্ছে থেকে দেশের একটি বেসরকারি মেরিটাইম ইনস্টিটিউট থেকে সামুদ্রিক প্রকৌশলী বিদ্যার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে যোগ দেন জাহাজের শিক্ষানবিশ হিসাবে। পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডের লিভারপুল জন মুর্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেন উচ্চতর প্রফেশনাল ডিগ্রি। বর্তমানে তিনি হংকং ভিত্তিক একটি কোম্পানির তেলবাহী জাহাজের সেকেন্ড অফিসার হিসাবে কর্মরত আছেন। এতসবের মধ্যেও মারুফ আঁকড়ে রেখেছেন তার ভালোলাগার গানকে। সাগরের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত বা বৃষ্টিস্নাত রংধনুর মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তার গানের খোরাক যুগিয়ে চলেছে। দূর দরিয়ায় শখের বসে গেয়ে উঠা সেই গান নৌ-তরীর সীমা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে, তৃপ্ত করছে শত ভক্ত-অনুরাগীর তৃষ্ণার্ত হূদয়।

