জয় হউক শুভ শক্তির

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২১, ২১:১২

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উত্সব শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হইতেছে। আজ মহাষ্টমী। পূরাণ অনুযায়ী অষ্টমী আর নবমী তিথির সন্ধিক্ষণেই অসুরকে বধ করা হইয়াছিল। সুতরাং অষ্টমী তিথি হইল অসুরবিনাশী শুদ্ধসত্তার আবির্ভাব তিথি। এই শুভক্ষণে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জানাই শারদীয় দুর্গোত্সবের শুভেচ্ছা।

শারদীয় দুর্গোত্সবের এই সময়টায় বাংলার প্রকৃতিতে এক অপূর্ব আবহ তৈরি হয়। প্রকৃতি উপাসনার ইহাই যেন মাহেন্দ্রক্ষণ। বর্ষা শেষ হইয়াছে, জল নামিতেছে, জাগিয়া উঠিতেছে জমি, সবুজে সবুজ প্রকৃতি-পরিবেশ। ফসল রোয়ার ঋতু। ইহা সেই সন্ধিক্ষণের উপাসনা, যাহাতে ফসল ভালো হয়, খাইয়া-পরিয়া সুস্থভাবে বাঁচিয়া থাকা যায়। খারাপ সময় কাটাইয়া ভালোর দিকে অগ্রসর হওয়া যায়। আর এই সময়টিতেই দুর্গোত্সবের আয়োজন হয়। শরতের এই উত্সবটির নেপথ্যে রহিয়াছে দশরথপুত্র শ্রীরামচন্দ্রের অবদান। বলা যায়, যুদ্ধে জয়লাভ করিবার অভিলাষ হইতেই দেবীর এই অকালবোধন বা আবির্ভাব। কথিত আছে, বনবাসী রামচন্দ্র স্বর্ণালংকার রাক্ষসরাজ রাবণের নিকট হইতে প্রিয়তমা স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করিবার বাসনায় শরত্কালে দেবীকে অকালবোধন করেন এবং এইভাবে প্রচলন ঘটে শারদীয় দুর্গাপূজার। এই সকল বিবেচনায় দুর্গাপূজা এক অর্থে রাজনৈতিক পূজাও। সাধারণত আশ্বিন শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন অর্থাত্ ষষ্ঠী হইতে দশম দিন অর্থাত্ দশমী অবধি পাঁচ দিন দুর্গোত্সব অনুষ্ঠিত হয়। আবার সমগ্র পক্ষটি দেবীপক্ষ নামেও আখ্যায়িত করা হয়। দেবীপক্ষের সূচনা হয় পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন; যাহা মহালয়া নামে পরিচিত। দেবী দুর্গাকে বলা হয় মাতৃশক্তির প্রতীক। এই শক্তি শৈবশক্তি। দেবীর এই রূপ লোকায়ত এবং বাস্তবতার বিশেষ প্রতিফলন বলা যায়। দেখা যায়, দেবী দুর্গার সংহারমূর্তি আর মাতৃমূর্তির মধ্যে কোনো ভিন্নতা নাই। অসুর দমনের সময়ও তিনি সন্তানসন্তুতি, এমনকি পতিকেও সঙ্গে রাখিয়াছেন। আবার ধরাধামে মানবমঙ্গলের জন্য আসিয়াও তিনি শত্রু অসুরকে সঙ্গে আনিতে ভোলেন নাই। রামের সেই যুদ্ধ যেমন অশুভ শক্তির প্রতিভূ অসুরের বিরুদ্ধে, ঠিক তেমনি দুর্গত দেবতাদের সপক্ষেও। ব্যক্তি মানুষের মধ্যে, সমাজের মধ্যে অসুররূপী যেই পশুত্ব রহিয়াছে, তাহা হইতে মনুষত্বে উত্তরণের যে চিন্তা সমাজ জীবনে প্রবহমান, সেই চিন্তারও প্রতিফলন ঘটিতে দেখা যায় দুর্গাপূজার মধ্যে। সেই কারণে দুর্গা দেবী হইতেছেন শুভ শক্তির আরাধ্য দেবী। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দেবী দুর্গার বাহন সিংহ; কিন্তু পৌরাণিক মতে, দেবী দুর্গা প্রতি বত্সর কৈলাস হইতে বাপের বাড়ি মর্ত্যলোকে আগমনের সময়ে চারটি আলাদা বাহন (অশ্ব, হস্তী, নৌকা এবং দোলা) ব্যবহার করিয়া থাকেন। স্বামীর বাড়ি ফিরিয়াও যান আলাদা আলাদা বাহনে। এইবার দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসিয়াছেন ঘোটকে, গমন করিবেন দোলায়। চারিদিকে সমস্ত কিছু উলট-পালট হইবার সম্ভাবনা ব্যক্ত করে ঘোটকে দেবীর আগমন। অন্যদিকে দোলায় দেবী দুর্গার গমনও অশুভ প্রভাব বিস্তার করিতেছে। অবশ্য গত দুই বত্সর সমগ্র বিশ্ব এমনিতেই এক ক্রান্তিকালের মধ্যদিয়া যাইতেছে। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ এখন কিছুটা হ্রাস পাইলে ইহা গত দুই বত্সরে বিশ্ব অর্থনীতিতে যেই ঝড় তুলিয়া গিয়াছে, তাহা ঠিক হইতে অনেক বত্সর লাগিবে। অধিকাংশ মানুষ এখন খাইয়া-পরিয়াও কোনো রকমে বাঁচিয়া থাকাটাকেই অনেক বড় জয় হিসাবে মনে করিতেছেন।

দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসিয়া অশুভ শক্তির বিনাশের মাধ্যমে শুভশক্তিকে প্রতিস্থাপন করেন বলিয়া মনে করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলিয়াও তাহাকে দুর্গা বলা হয়। দিকে দিকে সুর-অসুরের যে যুদ্ধ চলিতেছে, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাহারই প্রতীকী বিজয়ের প্রকাশ দেখিতে পান এই দুর্গোত্সবে। জয় হউক শুভ শক্তির।