শিশুদের মোবাইলফোনে আসক্তি ও মানসিক সমস্যা

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২১, ২১:১৪

গত বছরের মার্চে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এ বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ১৮ মাস দেশের সব প্রকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এমতাবস্থায় শিশু-কিশোররা একরকম গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। এই ঘরবন্দি শিশুদের ভবিষ্যত্ জীবন সুন্দর করার স্বার্থে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ সময় অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করার জন্য অভিভাবকগণ বাধ্য হন তাদের সন্তানদের হাতে এনড্রয়েড মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবসহ নানা ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস তুলে দিতে। অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি কৌতূহল থেকে শিশুরা নানা ধরনের গেমস খেলতে শুরু করে এবং এক সময় এটা নেশায় পরিণত হয়। আসক্ত শিশু-কিশোররা নাওয়া-খাওয়া ভুলে এক সময় মত্ত হয়ে পড়ে গেমসে। এসব ডিভাইসের নেশায় ভাসতে থাকা শিশুরা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না। পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে এমনকি শিক্ষায়তনেও দেখা মেলে এর নেতিবাচক প্রভাব।

যদিও এখন স্কুল-কলেজসহ কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ও হলসমূহ খুলে দেওয়া হয়েছে। এই বন্ধকালীন সময়েই অনলাইনে ক্লাসে অংশগ্রহণের নাম করে দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে মোবাইল ফোনে নানা সামাজিকমাধ্যম (ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি)-এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, টিকটক, পাবজি, ফ্রি ফায়ার, ইউটিউব, কার্টুনসহ হরেক রকম ভিডিও গেমসে আসক্তি; যার রেশ এখনো কাটেনি। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে মাথাধরা, মাথা ও হাত-পা ব্যথা, খাবারে অরুচি, ঘুম ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, ঘুমের ঘোরে নানাবিধ প্রলাপ বকা, আগ্রাসি আচরণ এবং তার সঙ্গে এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। কেউ কেউ নেশাসহ কিশোর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। যার প্রভাবে শতকরা ৫২ ভাগ শিক্ষার্থীই মানসিকভাবে বিষণ্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং তাদের অল্পতেই রেগে যাওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

করোনা মহামারির দীর্ঘ বন্ধের মধ্যে নানা ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের এমন আসক্তির প্রতিফলন মেলে এক বছর ধরে চালানো এক গবেষণায়। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা সংস্থা ‘উইলি’র ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্ট’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল তারা এক সংবাদ সম্মেলনে গত ৫ অক্টোবর প্রকাশ করেন। তারা দেশের ২১টি জেলায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া ১ হাজার ৮০৩ জন বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করেন।

 তাদের গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়, দেশের ৬৮ ভাগ শিক্ষার্থী দিনে দুই-চার ঘণ্টা মোবাইল ফোন নিয়ে সময় ব্যয় করছে। ৯ ভাগ শিক্ষার্থী কম্পিউটার স্ক্রিনে ও আট ভাগ ট্যাবে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে। ২০১৮-১৯ সালে যেখানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সমস্যাগুলোর মধ্যে ডায়রিয়া, পেটব্যথা, জ্বর-সর্দি ও চুলকানির সমস্যা সবচেয়ে প্রকট ছিল, সেই জায়গায় গত দেড় বছরে ২০২০-২১ সালে মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তির নানাবিধ জটিলতা, ঘুমের সমস্যা. বিষণ্নতা, খিটখিটে মেজাজ এবং জ্বর সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। এর পেছনে দীর্ঘ সময় ঘরবন্দি থাকা ও বিভিন্ন ডিভাইসের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তির সম্পর্ক পেয়েছেন গবেষকরা। গবেষকদের মতে, দেশের ৭০ ভাগ শিক্ষার্থীই শারীরিক কোনো কাজ বা খেলাধুলা/ব্যায়ামের সুযোগ পায়নি ২০২০ সালের প্রথম থেকেই এবং তাদের ৫০ ভাগ ঘরের বাইরে কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ একেবারেই পায়নি। মাত্র ২৫ ভাগ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করছে নিয়মিত অনলাইন ক্লাসের জন্য এবং ৪০ ভাগ শিক্ষার্থী কার্টুন, নাটক ও চলচ্চিত্র দেখার কাজে, ২৭ ভাগ শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক) ব্যবহারের জন্য এবং ১৭ ভাগ গেমস খেলার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।

 গবেষকদের দেওয়া তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার দেখা গেছে ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এবং সবচেয়ে কম মাদ্রাসা ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। পাবলিক হেলথ অব ইংল্যান্ড এর এক গবেষণায় জানা যায়, কোমলমতি শিশু-কিশোররা দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ভিডিও গেমস বা কম্পিউটারে চোখ আটকে রাখলে তাদের হীনমন্যতার শিকার, অবসাদগ্রস্ততাসহ মানসিক ভারসাম্য হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে মাথা ধরা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, ক্ষুধা মন্দা, আচরণগত পরিবর্তন ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়াসহ বিভিন্ন জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া শিশু-কিশোরদের অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার, মনোযোগ হ্রাস, হতাশা ও তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে ভিডিও গেমস আসক্তির সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়। এসব সমস্যা যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের একটি বড় অংশের জন্যই তা আশঙ্কার বিষয়।

চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসর্ডার) নামক মানসিক রোগের সৃষ্টি করে। এই রোগে আক্রান্ত শিশু নির্দিষ্ট কোনো কাজে পূর্ণ মনোযোগ প্রদান করতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর মতে বর্তমান বিশ্বে ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি অন্তত ৮০ লাখ শিশু-কিশোর এডিএইচডি-তে আক্রান্ত। এ রোগে আক্রান্ত শিশুরা খিটখিটে স্বভাবের হয়ে থাকে, বানিয়ে বানিয়ে অযাচিত কথা বলার পাশাপাশি তারা সবার সঙ্গে অহেতুক তর্কে লিপ্ত হয়। তাছাড়া মস্তিষ্কের যে অংশে (রিওয়ার্ড সেন্টার) মাদকদ্রব্য তথা হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবার প্রতি আসক্তি জন্ম নেয় ঠিক সেই অংশেই কিন্তু ইন্টারনেট বা ভিডিও গেমসের প্রতি আসক্তি জন্মায়।

এসব আসক্তি থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে অবশ্যই এসব কোমলমতি ও কৌতূহলী শিশু-কিশোরদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে এনড্রয়েড ফোন ও ইন্টারনেট সংযুক্ত বিভিন্ন ডিভাইস। তার সঙ্গে শিশু-কিশোরদের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাগুলো দীর্ঘায়িত হচ্ছে কি না, তা সুচারুভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। শিশুদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস আসক্তি কমানোর জন্য পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ়করণসহ পারিবারিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগের একান্তই প্রয়োজন। পাশাপাশি তাদেরকে দৈনন্দিন খেলাধুলা, শরীরচর্চা, বই পড়া, ঘরের কাজ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডা, সৃজনশীল কাজে উত্সাহ প্রদান, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বেড়ানো ও বিনোদনের ব্যবস্থা করাসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত এবং তাদের প্রতি সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখা অভিভাবকদের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি।

n লেখক :প্রাবন্ধিক ও সহকারী অধ্যাপক,

শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ