জিশান মাহমুদ
ছোটবেলায় পাঠ্যবইতে পড়েছি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের ‘কাজের লোক’ কবিতায়—
মৌমাছি, মৌমাছি,
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াও না একবার ভাই।
ওই ফুল ফুটে বনে
যাই মধু আহরণে
দাঁড়াবার সময় তো নাই।
ধারণা করা হয় মানুষ জন্মের প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে মৌমাছির আবির্ভাব হয়। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশেই মৌমাছি আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মৌমাছির নাম মেগাচিল প্রুটো।
মৌমাছি সাধারণত তিন প্রকার—রানি মৌমাছি, পুরুষ মৌমাছি এবং কর্মী বা বন্ধ্যা মৌমাছি। একটি মৌচাকে একটি মাত্র রানি মৌমাছি থাকে, তার তেমন কোনো কাজ থাকে না শুধু ডিমপাড়া ছাড়া। রানি মৌমাছি কয়েক বছর বাঁচে। ডিম পাড়তে রানি মৌমাছিকে সাহায্য করে কয়েক হাজার পুরুষ মৌমাছি। এদের নাম ড্রোন। রানি ও পুরুষ মৌমাছি ছাড়াও প্রতি চাকে শ্রমিক বা কর্মী মৌমাছি থাকে প্রায় ৪০ হাজার। এরা ডিম পাড়তে পারে না। এদের কাজ শুধু ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা এবং চাকে থাকা মৌমাছির বাচ্চা যাদের লার্ভা বলা হয় তাদের খাওয়ানো। এদের অন্যতম কিছু কাজ হলো মৌচাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মোম তৈরি করা, রেণু সঞ্চয় করা এবং মৌচাক পাহারা দেওয়া।
মৌচাকে থাকে কিছু জল্লাদ মৌমাছি! যারা কাজে অবহেলা করে তাদের শাস্তি দেওয়া এদের কাজ। এজন্যই প্রতিদিন মৌমাছির চাকের নিচে কিছু মৃত মৌমাছি দেখা যায়।
মৌমাছিদের ৫০০ গ্রাম মধু তৈরি করতে ২ মিলিয়ন ফুল দরকার হয় এবং ৯০০০০ কিলো উড়তে হয়। এরা প্রতি ঘণ্টায় ১৩ থেকে ১৫ মাইল বেগে উড়তে পারে। একটি চাকে ৬০০০০ মৌমাছি থাকে। মৌমাছি হলো পতঙ্গের মধ্যে একটি বিশেষ প্রজাতি, যাদের খাবার মানুষ সরাসরি খেতে পারে।
মৌমাছির শরীর তিন ভাগে বিভক্ত—মাথা, বুক এবং উদর। এদের মাথার গড়নটা বেশ জটিল। এতে রয়েছে জটিল গঠনের দুটি চোখ, যাদের বলা হয় পুঞ্জাক্ষী। এই পুঞ্জাক্ষী সহস্রাধিক আলোক-সংবেদী কোষ দ্বারা তৈরি। এদের মাথার ওপর ত্রিভুজাকৃতির আরো তিনটি চোখ এবং অ্যান্টেনা নামে আরো একটি অংশ রয়েছে। এই অ্যান্টেনার মাধ্যমে এরা গন্ধ পায়। মাথার দুটি অংশ রয়েছে—চোয়াল এবং জিহবা। ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করার জন্য গলায় একটি থলি আছে। বুকের অংশটি গঠিত হয়েছে ডানা, পা এবং বিভিন্ন পেশির সমন্বয়ে। শরীরে দুটি পাখনা আছে। চলাফেরার জন্য ছয়টি পা রয়েছে।
মৌমাছিরা যখন মধু সংগ্রহের জন্য ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায় তখন তারা লাল রঙের ফুলে বসে না। কারণ এরা লাল রং দেখতে পায় না। আল্ট্রাভায়োলেট বা অতি বেগুনি রশ্মি মানুষের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় মানুষ তা দেখতে পারে না, কিন্তু মৌমাছি দেখতে পায়। সাদা রং অতি বেগুনি রশ্মিকে প্রতিফলিত করে, তাই মৌমাছি সাদা রঙের ফুলে বেশি আকর্ষিত হয়।
বিভিন্ন রকম ফুল থেকে মৌমাছি নেক্টার সংগ্রহ করে যা হলো চিনি মেশানো পানি। এই নেক্টার দিয়েই মধু তৈরি হয়। ফুলের আরেকটি উপাদান হলো রেণু। হলুদ রঙের পাউডারের মতো দেখতে এই প্রোটিন সমৃদ্ধ উপাদানটি শিশু মৌমাছিদের খাওয়ানো হয়।
মৌমাছিদের প্রতিটি খোপ হয় ষড়ভুজাকৃতির। মৌচাকের আকৃতি ষড়ভুজাকার হওয়ায় প্রতিটি কোণায় মধু পৌঁছে। ফলে মধু গড়িয়ে পড়ে না।
মৌমাছি নিজের আত্মরক্ষার জন্য শত্রুদের হুল ফুটিয়ে দেয়। ছোট কীট-পতঙ্গকে হুল ফোটালে মৌমাছি সেটা বের করে আনতে পারে। কিন্তু বড় কীট-পতঙ্গ বা মানুষকে হুল ফোটালে সেটা বের করে আনতে পারে না বলে মৌমাছি মারা যায়। মৌমাছির চাক দিয়ে মোম তৈরি করা হয়।
