নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল জব্বারকে তার কক্ষের ভেতরে রেখে বাহির থেকে দরজা আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নুর বিরুদ্ধে। দুই বছর আগে নির্মাণ করা একটি ব্রিজের ঠিকাদারি কাজের বিল প্রাপ্তিতে বিলম্ব হওয়ায় নান্নু দলবল নিয়ে পিআইওর কক্ষে ঢুকে তাকে শাসান। কয়েক দফায় পিআইওর টেবিল চাপড়ানোর পর তাকে ভেতরে রেখে বাহির থেকে দরজা লক করে দেন।
ঘটনার বিষয়ে পিআইও আব্দুল জব্বার গতকাল বুধবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঘটনাটি ঘটেছে সপ্তাহ দুয়েক আগে। সরকারি চাকরি করতে এসে আমরা এখানে জিম্মি। তিনি (নান্নু) একটি ব্রিজের কাজ করেছিলেন দুই বছর আগে। পিআইও পদে আমার যোগদানের আগে তিনি ব্রিজটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে তিনি বিল পাননি। করোনার কারণে বিলের কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বিলম্ব হয়। তিনি যখন দলবল নিয়ে আমার রুমে আসেন তখন তাকে বললাম—বিল প্রস্তুত করতে বালু, রড ও ইটের টেস্ট রিপোর্ট লাগবে। রিপোর্টগুলো পাওয়ার পর বিল প্রস্তুত করে আমরা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে পাঠাব। এটা তিনি মানতে রাজি হচ্ছিলেন না, চিত্কার-চ্যাঁচামেচি শুরু করেন। এ সময় তিনি আমার টেবিলে জোরে জোরে কয়েকবার থাপ্পড় দেন। পরে বাইরে গিয়ে তিনি দরজা আটকে দেন।’ পিআইও আরো জানান, ‘পরে অবশ্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। তিনি (নান্নু) এসে বলেন—রাজনীতি করি, মাথা গরম ছিল।’
পিআইওর বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সোনারগাঁও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঝামেলা মিটে গেছে। দুই বছর আগে আমি ব্রিজের কাজ শেষ করলেও বিল পাইনি। তাছাড়া আমি দরজা আটকাইনি, অন্য ঠিকাদাররা উত্তেজিত হয়ে বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। আমি তাদেরকে শান্ত করে পরে দরজা খুলে দিয়েছি।’ নান্নুর দাবি—ইট, বালু ও রডের টেস্ট রিপোর্ট তিনি আগেও জমা দিয়েছিলেন, তবে পিআইওর দপ্তর তা হারিয়ে ফেলেছে।
সেদিনের ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, যুবলীগ নেতা নান্নু পিআইওর কার্যালয়ের বাইরে এসে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন। তার চারপাশে ১৫-২০ জনের একটি দল। তারা তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তখন নান্নুকে উচ্চ স্বরে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কি কোনো অন্যায় করেছি?’ জানা গেছে, সোনারগাঁও উপজেলায় বিভিন্ন দপ্তরের ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন রফিকুল ইসলাম নান্নু।
ঘটনার বিষয়ে সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি ঘটনাটি শুনেছি। তবে আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। যেহেতু কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি, তাই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি আসেনি।’
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে যুবলীগের কমিটি গঠনেও বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত নেতাকর্মীদের পরিবর্তে কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বিতর্কিত কেউ কেউ। যাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও জোরপূর্বক সরকারি ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে গড়ে ওঠা মাদক কারবারের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণও করেন কেউ কেউ। জমি দখল ও মাদক ব্যবসার অপরাধে কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতারও হয়েছিলেন। কারো কারো বিরুদ্ধে এখনো একাধিক মামলা চলমান। পদবঞ্চিত হয়ে সংগঠনের প্রকৃত নেতাকর্মীদের অনেকে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
উপজেলা যুবলীগের আগের কমিটির সভাপতি ছিলেন গাজী মজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শাহআলম রুপন। বর্তমান কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু ও সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দারের কমিটিকে অবৈধ দাবি করে আদালতে মামলা করেছিলেন গাজী মজিবুর রহমান।
এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম নান্নু ইত্তেফাককে বলেন, ‘মাদকের সাথে সম্পৃক্ত থাকা তো দূরের কথা, আমি জীবনে কোনো দিন সিগারেটও খাইনি। ছোটবেলা থেকে আমি মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমি তিন বার হজ করেছি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমার জানামতে একটি ইউনিয়নের একজন নেতার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। তাও তাকে কমিটিতে রাখতে হয়েছে একজনের তদবিরের কারণে।’
