অবসরের পর গ্রামে থাকবো :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:২২

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের পরে তিনি তার গ্রামে গিয়ে বাস করবেন। এটাই তার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। গতকাল গাজীপুরে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

প্রতিটি গ্রামকে শহরে পরিণত করার তার সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো গ্রামের লোকদের কাছে শহরের সকল সুযোগ সুবিধা পৌঁছে দেয়া, যাতে তারা উন্নত জীবন পায় এবং সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারে। গ্রামের সুন্দর ও নির্মল পরিবেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তিসহ সকল সুযোগ সুবিধা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে শহরের প্রতি মানুষের আর অপ্রয়োজনীয় মোহ থাকবে না বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা পার্টি’র (ভিডিপি) ৩৯তম জাতীয় সমাবেশ উপলক্ষে আনসার ও ভিডিপি’র শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাদের পারফরমেন্স প্রদর্শন করেন। আনসার ও ভিডিপি লেকে আনসার সদস্যদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৌকায় উঠে দুই শিশুর নৃত্য দেখে প্রধানমন্ত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে বলেন, নৌকায় এই দৃশ্য দেখে তার কিশোর বেলার স্মৃতি স্মরণে আসছে। তিনি বলেন, ‘আমার পিতামহের একটি বিরাট পানসি নৌকা ছিল, এটিতে দুইটি কক্ষ ও জানালা ছিল। আমি যখন এটিতে উঠতাম, জানালার কাছে বসে আমার হাত দিয়ে পানি স্পর্শ করতাম।’

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘নৌকায় অন্যরাও থাকতো বিশেষ করে আমার ভাই (শেখ) কামাল। সে নৌকার ছাদ থেকে লাফ দিত এবং নৃত্য করতো। যখন আমি নৌকা দেখি, আমার কিশোরী বেলার স্মৃতি স্মরণে আসে।’ শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আজকের শিশুদের আরো উজ্জ্বল এবং সুন্দর ভবিষ্যত্ চাই। পাশাপাশি তারা প্রযুক্তিভিত্তিক হয়ে উঠুক। আরো উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণে তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছেন, তার লক্ষ্য ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা। আমাদের অঙ্গীকার এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা প্রতিটি গ্রামে পরিবর্তন আনবেন যাতে গ্রামের প্রতি সবারই আকর্ষণ তৈরী হয় এবং সেখানকার দূষণমুক্ত পরিবেশে বসবাসের জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। 

‘নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা

রাখছে আনসার-ভিডিপি’

এর আগে বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৩৯তম জাতীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,  বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশের সর্ববৃহত্ জনসম্পৃক্ত শৃঙ্খলা বাহিনী। এ বাহিনীর প্রায় ৫৫ হাজার পুরুষ এবং মহিলা আনসার সদস্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জনসম্পদ রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। অন্যদিকে দুটি পূর্ণাঙ্গ মহিলা ব্যাটেলিয়ানসহ ৪১টি ব্যাটালিয়নের প্রায় ১৭ হাজার সদস্য পার্বত্য অঞ্চল ও সমতলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত স্ট্রাইকিং ফোর্স এএসএফ দেশের অভ্যন্তরে কূটনৈতিক ও কূটনৈতিক জোনের নিরাপত্তায় দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে সশ্রদ্ধ সালাম জানায় আনসার বাহিনীর একটি চৌকষ দল। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হওয়ার পর একটি খোলা জিপে করে প্যারেড পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দে  প্রায় ৫ লাখ আনসার ভিডিপি সদস্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দক্ষতার সঙ্গে ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনের সময় ৫ জন আনসার সদস্য জীবন দিয়েছেন। আজকের সমাবেশ অনুষ্ঠানে তাদের মরণোত্তর সাহসিকতা পদক দেয় হচ্ছে। দায়িত্বপালনের পাশাপাশি এ বাহিনীর সদস্যগণ খেলাধুলা ও দেশীয় সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। জাতিসংঘ মানদণ্ডে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃত। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮৬ তে উন্নীত হয়েছে। মাত্র ১০ বছরের শিক্ষার হার ৪৫ থেকে ৭৩ শতাংশ পৌঁছেছে। দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে, বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে যাচ্ছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়ে চলছে, পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, মেট্রোরেল নির্মাণ, কর্ণফুলী টানেল স্থাপনের কাজ চলছে। এছাড়া নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। পুরুষ ও নারীর সমতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৪৭ তম এবং টানা তিন বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে দারিদ্র্যের অভিশাপ হতে মুক্ত করা।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আকম মোজাম্মেল হক এমপি, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, মেহের আফরোজ চুমকি এমপি, ইকবাল হোসেন সবুজ এমপি, গাজীপুর মেট্রাপলিটন পুলিশের কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর, পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পাঁচজনকে মরণোত্তর পদকসহ ১৫৩ জন আনসার সদস্যকে পদক প্রদান করেন। পরে তিনি আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের পরিবেশিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন ও তাদের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্পের স্টল ঘুরে দেখেন।