রাজধানীর নিউ মার্কেট ও গাউছিয়া এলাকায় যেখানে-সেখানে চলছে গাড়ি পার্কিং। এমনকি এই পার্কিং থেকে বাদ যাচ্ছে না মূল সড়কও। মার্কেটের ব্যবাসায়ীদের অভিযোগ, সড়কের বিশাল এলাকাজুড়ে নিয়মিত পার্কিং চলছে। আর এই অবৈধ পার্কিংকে পুঁজি করে চলছে টোকেন বাণিজ্য।
রাস্তার ওপর কেউ এসে প্রাইভেটকার বা মোটর সাইকেল নিয়ে দাঁড়ালেই তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে পার্কিং টোকেন। নেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ৫০ টাকা করে।
সরজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর ব্যস্ততম এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যাল রোড থেকে নিউ মার্কেট ও গাউছিয়া মার্কটের মোড়ে এসেছেন বাবু সাহেব তারা। তিনি মোটরসাইকেল রাখা মাত্রই দু’জন লোক ছুটে এলেন। তারা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নামে একটি পার্কিং টোকেন ধরিয়ে দিয়ে ৩০ টাকা আদায় করলেন।
![]()
(পিকাআপ থেকে টাকা দাবি করায় চালক ও লাইনম্যানের মধ্যে তর্ক চলছে। ছবি: নভেম অপু)
এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যাল রোড থেকে নিউ মার্কেট ও গাউছিয়া মার্কটের মোড় পর্যন্ত গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ডিএসসিসির লোগো সংবলিত হলুদ টোকেন দিয়ে চাঁদা তোলেন মোহাম্দদ আলী (প্রধান লাইনম্যান)। তিনি ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘প্রায় ৬ মাস হলো আমরা ডিএসসিসির কাছ থেকে টেন্ডার নিয়েছি। তাই এখানে পার্কিং করা মোটর সাইকেলের জন্য ২০ টাকা ও প্রাইভেটকারের জন্য ৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করি।’
মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, নিউমার্কেটে প্রবেশে চারটি গেট রয়েছে। ডিএসসিসি গেটসংলগ্ন একটি রাস্তার অংশও পার্কিংয়ের জন্য ইজারা দিয়েছে। কিন্তু বাকি তিনটি গেটের পার্কিং থেকেও টাকা তোলা হয়। ডিএসসিসির নাম ও লোগো সংবলিত রশিদ দিয়ে টাকা আদায় করা হচ্ছে। ডিএসসিসি প্রতিটি গাড়ির জন্য ১৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও এখানে ২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া পুরানা পল্টন লেনের রাস্তা বা বিজিবি গেটের সামনে দিয়ে বটতলা হয়ে বনলতা মার্কেটের সামনের রাস্তায় যানবাহন চলাচল করলেও ২০ টাকা করে দিতে হয়। এ নিয়ে প্রায়ই যানবাহনচালক আর মালিকদের সঙ্গে টাকা আদায়কারীর ঝগড়া লেগেই থাকে।
![]()
(নিউ মার্কেট ও গাউছিয়া মার্কটের মোড়ে কার পার্কিং, বাইকে বসে আছে তিনজন লাইনম্যান। ছবি: নভেম অপু)
নিউ মার্কেট এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আসা সংবাদকর্মী মেসবাহ য়াযাদ বলেন, ‘একটি সাদা রঙের টোকেন (ঢাকা নিউ মার্কেট কমপ্লেক্স-ইজারাদার রিমন এন্টারপ্রাইজ) দিয়ে আমার কাছ থেকে ৩০ টাকা আদায় করে। ওরা গাড়িভেদে গাড়িচালক বা মালিকদের কাছ থেকে টোকেন দিয়ে চাঁদা তোলেন।’
নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, এই এলাকায় পার্কিংয়ের ইজারা কয়েক বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে একটি সিন্ডিকেট। তারা পার্কিংয়ের নামে বছরে কমপক্ষে সাড়ে তিন কোটি টাকা আদায় করলেও ডিএসসিসি কোষাগারে জমা হয় নামমাত্র অর্থ। তারা আরও জানান, এই সিন্ডিকেটে আছেন ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ফরমান মোল্লা। নিজের অনুসারীদের নিয়ে তিনি পুরো নিউমার্কেট এলাকা থেকেই রশিদ দিয়ে টাকা তোলেন।
টোল আদায়ে নিয়োজিত কয়েকজন জানান, তারা পুরো নিউমার্কেট এলাকায় গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ২০ টাকা হারে আদায় করেন। প্রতিদিন গড়ে কমবেশি ৪০০ যানবাহন আসে। প্রতিদিন ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ওঠে। মাসে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ লাখ; আর বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা।
![]()
(ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নাম ও লগো সম্বলিত কার পার্কিংয়ের টোকেন। ছবি: নভেম অপু)
অতিরিক্ত টোল আদায়ের কথা স্বীকার করে ইজারাদার ডিএসসিসির ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ সভাপতি ফরমান মোল্লা বলেন, ‘আমি প্রায় ১০ লাখ টাকা দিয়ে এই পার্কিং ইজারা নিয়েছি। এর বাইরে বিভিন্ন কাজে আরও পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন ইজারার মাধ্যমে এই খরচের টাকা তুলছি।’ এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল হক জানান, ‘বিষয়টি আমার এখতিয়ারে নেই। এই বিষয়ে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমি মিটিংয়ে আছি।’ এরপর আরও তিন দিন তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।
![]()
(রাস্তা দখল করে গাড়ি পার্কিং। ছবি: নভেম অপু)
ব্যস্ততম সড়কে গাড়ি পার্কিং নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ঢাকা শহরে অবৈধ পার্কিং থেকে মাসে প্রায় ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য প্রতি মাসে গড়ে ট্রাফিক পুলিশ ৭০ থেকে ৯০ হাজার মামলা করে। এসব মামলা থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। তিনি আরও জানান, ঢাকা শহরে যে হারে গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, সে হারে রাস্তা বাড়ছে না। পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও অপ্রতুল। সিটি করপোরেশনের উচিত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা।’ না হলে আইন কিংবা জরিমানার মাধ্যমে এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ইত্তেফাক/এনএইচ
