সন্তানের আবদার। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাবে, স্কুল-কলেজে যাতায়াত করবে, একটু দূরে কোথাও যাবে। সন্তানের এই চাওয়া পূরণ করতে অনেক বাবা-মা হাতে তুলে দিচ্ছেন মোটরসাইকেলের চাবি, কখনো পরিবারের প্রাইভেটকারের স্টিয়ারিং। তাদের চোখে এটি সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, স্বাধীনতা কিংবা গাড়ি চালানো শেখানোর সুযোগ। অথচ সেই সন্তানের বয়স হয়নি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার, নেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সড়কে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা।
অনেক ক্ষেত্রে হিরোইজম দেখাতে গিয়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা ট্রাফিক আইন অমান্যের পরিণতিতে ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছেন পথচারী, শ্রমিক, রিকশাচালক ও অন্য যানবাহনের যাত্রী; আবার কখনো নিজেরাই পড়ছে মৃত্যুর মুখে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অনভিজ্ঞ সন্তানের হাতে পরিবারের গাড়ি তুলে দেওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের হাতে তুলে দেওয়া এই চাবি কখনো হয়ে ওঠে অন্যের কিংবা নিজের ‘মৃত্যুর চাবি’।
বারিধারায় ফুটপাতে বসা শ্রমিকের মৃত্যু :ঘটনার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর বারিধারায়। গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান (২৪)। এ সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের আসনে থাকা এক কিশোরকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়।
পরিবারের গাড়ি অপ্রাপ্তবয়স্ক বা লাইসেন্সবিহীন সন্তানের হাতে তুলে দেওয়ার ঝুঁকি এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসা একজন কিশোরের ভুলের মাশুল শুধু তার নিজের পরিবারকে দিতে হয় না—পথচারী, রিকশাচালক, শ্রমিক কিংবা অন্য গাড়ির যাত্রীর জীবনও মুহূর্তে বিপন্ন হতে পারে।
মোহাম্মদপুরে রিকশাকে চাপা :এর আগে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অপ্রাপ্তবয়স্কের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়ার আরেকটি ঘটনা ঘটে। ইকবাল রোডে ১৫ বছর বয়সি এক কিশোর প্রাইভেটকার চালানোর সময় একটি রিকশাকে চাপা দেয়। এতে রিকশাচালক, এক দম্পতি ও তাদের তিন বছরের শিশু আহত হয়। পুলিশ জানায়, এক তরুণ ঐ কিশোরকে গাড়ি চালাতে দিয়েছিলেন। পরে কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে এবং ঐ তরুণকে কারাগারে পাঠানো হয়।
গত জুন মাসে চট্টগ্রামের হালিশহরে বাবার প্রাইভেটকার নিয়ে বের হয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় জড়ায় ১৯ বছর বয়সি তানিম হোসেন রাব্বি। পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। বাবার গাড়ি চালানোর সময় সাইকেল আরোহী ওসমান গণি সাকিবকে ধাক্কা দিলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পুলিশ তানিমকে গ্রেফতার করে এবং গাড়িটি জব্দ করে।
প্রাইভেটকারের পাশাপাশি মোটরসাইকেলেও কিশোর-তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলের চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। গত ২৭ আগস্ট ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মাত্র তিন দিন আগে কেনা নতুন মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে বাসের ধাক্কায় নিহত হয় ১৭ বছর বয়সি কাওসার আহমেদ ওরফে রাতুল এবং ২০ বছর বয়সি রাজু মাতুব্বর। পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল কাওসার। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার মাত্র তিন দিন আগে তাকে নতুন মোটরসাইকেলটি কিনে দেওয়া হয়েছিল।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান :অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণদের সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি কেবল বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশ তরুণ বয়সি বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর হিসাবও উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আনে। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৬৪ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৩২৮ জনের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছর। একই সময়ে ৩ হাজার ৮৪১ শিক্ষার্থী মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছেন, যা মোট শিক্ষার্থী মৃত্যুর ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রবণতা বেশি বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সড়ক দুর্ঘটনার জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন হিসাব থাকলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের হাতে সংঘটিত দুর্ঘটনার আলাদা পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ফলে বছরে কত কিশোর লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাচ্ছে, তাদের কারণে কত দুর্ঘটনা ঘটছে এবং এসব ঘটনায় কত জন নিহত বা আহত হচ্ছেন, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র অজানা। তথ্যের এই ঘাটতি সমস্যাটির প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝার পথে বাধা তৈরি করছে।
আইন আছে, মানার দায়িত্ব কার :অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। লাইসেন্স বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ছাড়া পাবলিক প্লেসে মোটরযান চালানো আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু পরিবারের গাড়ি হওয়ায় অনেক অভিভাবক এই নিষেধাজ্ঞাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কখনো গাড়ি চালানো শেখানোর নামে, কখনো সন্তানের আবদার পূরণে, আবার কখনো অল্প দূরত্বের কথা ভেবে কিশোরের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে গাড়ির চাবি। এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া অভিভাবকদের ধারণা, পরিচিত রাস্তা, কম দূরত্ব কিংবা নিজের গাড়ি হওয়ার কারণে ঝুঁকি কম। এই ভুল সিদ্ধান্ত কখনো কখানো বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়। বড় মাসুল দিয়ে তখন বুঝতে পারেন যে ভুল হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস আহম্মেদ খোকন বলেন, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভালোবাসার নামে দ্রুতগতির যান তুলে দেওয়ার আগে বয়স, বৈধ লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে, পরিবারের আনন্দই কখনো অন্য পরিবারের সারা জীবনের কান্নার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, উঠতি বয়সি কিশোর-তরুণদের হাতে মোটরসাইকেল কিংবা প্রাইভেট কারের চাবি তুলে দেওয়ার আগে অভিভাবকদের আবেগের চেয়ে সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। তিনি বলেন, শুধু বেপরোয়া গতিই নয়, মহাসড়কে কিশোর-তরুণদের মোটরসাইকেল চালানোর প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ, এরা মহাসড়কে কীভাবে মোটরসাইকেল চালাতে হয়, কোথায় গতি কমাতে হয় কিংবা ভারী যানবাহনের সঙ্গে কতটুকু নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হয়—এসবের সঠিক ধারণা তাদের নেই। গাড়ি চালানোর মতো দায়িত্বশীল কাজ কেবলমাত্র ধারণার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশে অনেক অভিভাবক সন্তানের আবদার পূরণ করতে গিয়ে এমন পণ্য তাদের হাতে তুলে দেন যেগুলো ব্যবহারের বয়স তাদের হয়নি। এটা খুবই বিপজ্জনক চর্চা। এর মধ্যে আমরা সবচেয়ে বেশি লক্ষ করি মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার কিংবা দামি মোবাইল ফোন। কখনো কখনো তার যে বয়স কিংবা যে ক্লাসে পড়ে সেই অনুপাতে তার যে হাত খরচ লাগে তার চেয়ে অধিক অর্থ তাকে দিয়ে দেওয়া হয়। এতে উপকারের চেয়ে ক্ষতি হয় বেশি। অনেক কিশোর তাদের বাবা-মাকে না জানিয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যায়। এসব কারণে সন্তান বখে যাওয়ার সম্ভাবনা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এসব অযৌক্তিক আবদারমূলক চাহিদা পূরণের কারণে অনেকেই আহত বা নিহত হচ্ছে। অনেকে পঙ্গু জীবনযাপন করছেন। সন্তানদের অযৌক্তিক আবদার পূরণ করে নয়, সঠিক প্যারেন্টিংয়ের মাধ্যমে তাদেরকে শৈশব থেকেই বড় করার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল পরিবার নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়বদ্ধতা আছে।
