‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক’

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ২১:২৯

আমরা প্রায় সবাই স্কুলে শেখ ফজলল করিমের ‘স্বর্গ ও নরক’ কবিতা পড়েছি—কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর? / মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!’ এর মাঝখানে এক জায়গায় তিনি লিখেছেন—‘প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরস্পরে,/ স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরি কুঁড়ে ঘরে।’

কুঁড়ে ঘর না, আমরা বেশির ভাগ এখন চড়ুইপাখির মতো অট্টালিকায় বসবাস করি। দেশের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। দেশের বাইরেও আমরা কোটিখানেকের মতো বাঙালি বিদেশ-বিভুঁইয়ের ভালোমন্দ মিলিয়ে নানান অবস্থার মধ্যে থাকি। আমি আমেরিকার যে অঞ্চলে থাকি, সেখানে দক্ষিণ আমেরিকার আমেরিকানরা বেশি থাকেন। তারা ধর্মভীরু, এখানে দুই হাত পর পর চার্চ, আর কেউ কেউ একটু গোঁড়াও বটে। এখানের এক শ্রেণিকে বলা হয় ‘লাল গ্রীবার আমেরিকান’। তাদের বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে এক জায়গায় জানতে পারলাম—তাদেরকে রক্ষণশীল, বর্ণবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল বলা হয়েছে (সাউদার্ন কালচার্স, প্যাট্রিক হুবার)।

আমি যে ইউনিভার্সিটিতে কাজ করি সেখানে ঢোকার পথে একটা প্রাচীন চার্চ ছিল। লম্বা লাল একতলা দালান, দালানের মাথায় ক্রস আর সামনে বড় একটা ওক গাছ। শান্ত-সৌম্য এক পরিবেশ। দেখলেই শান্তি শান্তি লাগে।

ইউনিভার্সিটিতে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, পার্কিং লটে নতুন একটা বিল্ডিং বানানো হবে, অনেক কিছুই ভাঙচুর করা হচ্ছে। একদিন সকালে ভার্সিটিতে ঢুকার পথে দেখি চার্চটাকে ভেঙে ফেলা হয়েছে, শুধু বড় গাছটা রয়েছে।

চার্চ ভেঙে ফেলার জন্য কোনো মানববন্ধন বা মিছিল কিছুই দেখিনি। শ্রিভপোর্ট ও বোঝর দুইটা যমজ সিটি, ‘রেড রিভার’ সিটি দুটিকে আলাদা করেছে। এই দুই সিটিতে মসজিদ আছে তিনটা। এর ভেতরে দুটোই তৈরি হয়েছে চার্চ থেকে। আগে চার্চ ছিল; চার্চ অথরিটি মসজিদ অথরিটির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। কিন্তু এজন্য গোঁড়া, ধর্মান্ধ কেউ মিছিল মিটিং বা হামলা ভাঙচুর করেনি।

আমার বাড়ির সবচেয়ে কাছের মসজিদটি বছর দুই আগে কেনা হয়েছে। আগে এটি একটি চার্চ ছিল। মসজিদটির দাম প্রায় এক মিলিয়ন ডলার। মসজিদ অথরিটির কাছে অত টাকা তখন ছিল না। আবার মসজিদ অথরিটি ব্যাংক থেকে সুদ দিয়ে ঋণও নিতে চাচ্ছিল না ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে। চার্চ অথরিটি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিনা সুদে মসজিদের কাছে বাকিতে তাদের স্থাপনা বিক্রি করেছিল।

মসজিদটি যেদিন উদ্বোধন হয় সেদিনের সে অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছিলাম। শ্রিভপোর্ট সিটির আমেরিকান মেয়র সেদিন বলেছিলেন, ‘ছোট্ট একটু ইউরি ড্রাইভ যেন আমেরিকার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে প্রটেস্টেরিয়ানদের চার্চ আছে, তার থেকে একটু এগোলেই ক্যাথলিকদের গির্জা, এরপরেই ব্যাপ্টিস্টদের চার্চ। এত দিন এখানে কোনো মসজিদ ছিল না। এখন এখানে একটা মসজিদও হলো। সবাই যার যার মতো করে তার ধর্মীয় আচার-আচরণ পরিচালনা করছে। কোনো হানাহানি, হইচই নেই। এমন করেই আমরা নানা মত, নানা পথ, নানা ধর্ম-বর্ণের, নানান মানুষ মিলেই আমরা আমাদের দেশকে গড়ে তুলব।’

আমি এখানে কাউকে ছোট বা বড় করছি না। আমি অবনত মস্তকে শুধু নিজেকেই দেখছি। কত ছোট আমি, কত হীন মনমানসিকতা আমার। আমি কত সহজেই ধর্মীয় হানাহানি, মারামারিতে লিপ্ত হই। যেন আমি সুযোগের অপেক্ষায় থাকি, উছিলা পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ি। মহান আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের সুমতি দেবেন। সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী চিকিত্সক

(শ্রিভপোর্ট, লুইজিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র)