অবশেষে সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো দেশের ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে (ক্লাস্টার সিস্টেম) ভর্তি পরীক্ষা ১৭ অক্টোবর (রবিবার) থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালগুলোর স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা সশরীরে এই ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন। শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সশরীর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। একই ধরনের পাঠদানকারী সমমনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জোট একটিমাত্র ভর্তি পরীক্ষা নেবে।
গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা এমন একটি পরীক্ষা যেখানে কোনো পাশ-ফেল থাকছে না। মূলত ভর্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্কোরিং করা হবে। এরপর স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নেবে কোন কোন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ব্যাংক থেকে স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি পরীক্ষার বিধিবদ্ধ নিয়মানুসারে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। মূল সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা কমিটি ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, কৃষি বিষয়ক সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছর স্নাতক শ্রেণিতে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বহুদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বহুবার গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। তাই বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে এ কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি মৌসুমে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ লাখো শিক্ষার্থীর হয়রানির প্রসঙ্গ প্রতিবছর আলোচিত বিষয়। প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর পরীক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই সময়টা কাটে ছাত্রছাত্রীদের টেনশনের মধ্য দিয়ে। কোথাও ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের মধ্যে এই দুশ্চিন্তা কাজ করে। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, সেখানে থাকার চিন্তা সব মিলিয়ে তাদের বেশ বড় ধরনের সংগ্রাম করতে হয়। এক জন শিক্ষার্থী যে কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র একটি বিষয়ে ভর্তি হয়। অথচ তাকে অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে দেশময় ঘুরে বেড়াতে হয় এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এতে অর্থ ও সময় তো নষ্ট হয়ই, অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে ছোটাছুটির কষ্ট করতে হয় তার চেয়েও বেশি। জীবনযুদ্ধ থেকে কোনো অংশে কম না এই ভর্তিযুদ্ধ। প্রতি বছর যে হারে পাশকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সংখ্যা তার চেয়ে অনেক কম। তারপর আবার রয়েছে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়, পছন্দের বিষয় নির্বাচন। সব মিলিয়ে বিশাল চাপ। যে সমাধানটি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনায় এসেছে তা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা দেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মত থাকলেও আমাদের বিরাট এ কর্মযজ্ঞ যে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়, তাদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। তাই এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান মহামারি করোনা বাস্তবতায় সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পদ্ধতি চালু করা একান্ত প্রয়োজন। বৈশ্বিক মহামারির এই কঠিন সময়ে অপরিচিত স্থান, আবাসনের অনিশ্চয়তা, যাত্রাকালে যানবাহন সমস্যা ইত্যাদিসহ মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের মুক্তি দিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ এখন কেউ বিবেচনা করছে না। তবে শুধু শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের ঝামেলা মুক্ত করার লক্ষ্যেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি ব্যবস্থাকে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করে একটি স্থায়ী গ্রহণযোগ্য ভর্তি ব্যবস্থার স্বার্থে সমন্বিত ভর্তি ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবে। প্রচলিত ধারণা এটাই যে, কোচিং ছাড়া কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পায় না। তাই অনেক অভিভাবকের মধ্যে নামিদামি কোচিংয়ে সন্তানকে ভর্তি করাতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল নন তাদের ক্ষেত্রে ভালো কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয় না। সমন্বিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে কোচিং সেন্টারগুলোর শুধু প্রচারণা নয়, ভর্তি বা কোচিং বাণিজ্য প্রতিহত করা যেতে পারে। ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার পর আবার শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম তোলার পালা। আলাদা আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে আলাদা আলাদা ফরম তুলতে হয়। ফরম কেনার টাকাও অনেক পরিবারের থাকে না। সেখানেও গরিব মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ে। এক জন সামর্থ্যবান শিক্ষার্থী প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফরম তুলে ফেলে। আবার দেশের এক প্রান্তে এক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবস্থিত। দেখা যায়, আজ ঢাকায় তো আগামীকাল সিলেট পরশু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা। ফলে ঢাকার পরীক্ষা শেষ করে ছুটতে হয় গাড়ি ধরতে। বিশ্রাম নেওয়ার সময়টুকুও থাকে না। তার পরদিন হয়তো পরীক্ষা থাকে দেশের অন্য কোনো প্রান্তে। এভাবে ছুটতে গিয়ে যাদের গাড়ি যানজটে আটকে থাকে, তাদের জন্য কারো করার কিছইু থাকে না। অথচ তাদের এক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র দোষ নেই। একারণে গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকের জন্যও মঙ্গলজনক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো এতো বড় একটি ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনায় কিছুটা সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হলেও পরীক্ষার্থীদের স্বার্থে এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
n লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
