সাধন সরকার
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে মৃত ডলফিনের ভেসে আসায় সাগরের প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুয়াকাটা সৈকতে ২১টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। শুধু আগস্টেই ভেসে এসেছে ৯টি মৃত ডলফিন। গত বছরও ছয়-সাতটি মৃত ডলফিন ভেসে আসার খবর জানা যায়। সব মিলিয়ে প্রতি বছর ১০টির বেশি মৃত ডলফিন ভেসে আসার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ বছর সংখ্যাটা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি তিস্তা নদীতেও মৃত ডলফিন ভেসে আসার খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্বের ৮০ প্রজাতির ডলফিনের মধ্যে অন্তত ১২ প্রজাতি আছে বাংলাদেশে। ইরাবতী ডলফিনের প্রজাতি বিশ্ব থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে, অথচ বাংলাদেশে ইরাবতী ডলফিনের বড় আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। মাত্রাতিরিক্ত ডলফিনের মৃত্যু সাগরের বাস্তুতন্ত্রের বড় ধরনের পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত কি না তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ডলফিন থাকলে পানির গুণ ভালো থাকে। মাছের বংশবৃদ্ধিও ভালো হয়। সাগরের যে অংশে ডলফিন থাকে সে অংশে মাছও বেশি পাওয়া যায়। ডলফিন সাগরের সম্পদসমূহের মধ্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ডলফিনের উপস্থিতি মানেই নদী বা সাগরের জলীয় পরিবেশ অনেকটাই স্বাভাবিক।
ভেসে আসা মৃত ডলফিনের বেশির ভাগেরই শরীরে হয় আঘাতের চিহ্ন না হয় শরীরে ও মুখে জাল জড়ানো ছিল। ডলফিন গভীর পানিতে থাকলেও ১৫-২০ মিনিট পর পর সাগরের উপরিভাগে আসে। ঠিক তখনই জেলেদের জালে আটকে পড়ার ঘটনা ঘটে। ডলফিন সাগরের নিরীহ গোত্রের প্রাণী। এরা জেলেদের জালে একবার আটকা পড়লে নিজেকে খুব কম সময়ই রক্ষা করতে পারে। জেলেদের জালে আটকা পড়ে শ্বাস নিতে না পেরে অনেক সময় ডলফিন মারা যায়। ধারণা করা হয়, কচ্ছপ ও হাঙ্গর গভীর জলে জালে আটকে গেলে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে জাল থেকে বের হতে পারে; কিন্তু ডলফিনের পক্ষে সেটা অনেক সময় সম্ভব হয় না। আবার সাগরে জেলেদের ফেলে দেওয়া পলিথিন বা ছেঁড়া জালে আটকে ডলফিনের মৃত্যু হচ্ছে। অনেক সময় অক্সিজেন নিতে এসে ডলফিন যখন পানির ওপরে চলে আসে তখন ট্রলার অথবা জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েও মারা যাচ্ছে। কিছু কিছু সময় দেখা যায়, জেলেদের জালে ডলফিন আটকা পড়লেও অসতর্ক কিংবা ঝামেলার কারণে জেলেরা ডলফিন না ছাড়িয়ে জাল প্যাঁচানো অবস্থায় পানিতে ফেলে দেয়। ফলে জালে আটকে ডলফিন মারা যায়। গভীর পানিতে মাছ ধরার হাজারি বড়শিতে আটকা পড়েও ডলফিন মারা যাচ্ছে। আবার দূষণের শিকার হয়েও মারা যাচ্ছে ডলফিন।
সমুদ্রের ভারসাম্য রক্ষায় ডলফিন রক্ষার বিকল্প নেই। এজন্য জেলেদের সচেতনতা সবার আগে প্রয়োজন। ডলফিন জালে আটকা পড়লে দ্রুত তা ছাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সাগরে ছেঁড়া জাল ও প্লাস্টিক পণ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। নদী ও সাগরে কারেন্ট জালসহ অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। যেসব এলাকায় ডলফিনের আধিক্য বেশি সেসব নির্দিষ্ট এলাকায় জাল পাতা বন্ধ করা করতে হবে। সব ধরনের দূষণ বন্ধ করে ডলফিনের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা উচিত। ডলফিন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জনবল বাড়ালে আরো বেশি নজরদারি ও তদারকি করা সম্ভব। যা হোক সামুদ্রিক অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। কেননা জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্যহীনতা সামগ্রিক প্রতিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
ঢাকা
