কুমিল্লার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করিয়াছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টা রুখিয়া দিতে সর্বাত্মক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইয়াছে। তাহার পরও গত শুক্রবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সহিংস ঘটনা ঘটিয়াছে। পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি বিজিবি টহল দেয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ হইতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিমা বিসর্জন দিয়াছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ। যদিও বিজয়নগরসহ কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীদের সহিত পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়াছে। ঢাকার বাহিরে নোয়াখালীতে পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত ছিল। সেইখানে মন্দির, পূজামণ্ডপ, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে অপ্রত্যাশিতভাবে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের পরিস্থিতিও শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রশ্ন হইল—কঠোর সতর্কতার মধ্যেও কীভাবে নূতন করিয়া এইরূপ সহিংসতার ঘটনা ঘটিল? নোয়াখালীতে কীভাবে নিহত হইলেন এক জন? ইহাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বিক সক্ষমতা লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু বাস্তবে দেখা যাইতেছে কোনো কোনো থানায় পুলিশের পর্যাপ্ত গাড়ি নাই। হয়তো দুইটি গাড়ি রহিয়াছে; কিন্তু তাহার মধ্যে একটি নষ্ট বা অচল। এই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ কীভাবে এমন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করিবে? একটি ডিভিশন বা বিভাগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে পরিমাণ অস্ত্র ও অন্যান্য সাজসরঞ্জাম থাকা দরকার, তাহা কি আমাদের আছে? আমরা ইতিপূর্বে বহুবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করিবার এবং তাহাদের যানবাহন ও আবাসন সমস্যার প্রতি নজর দেওয়ার কথা বলিয়াছি। গত এক দশকে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যে উন্নয়ন হয় নাই, তাহা আমরা বলিতেছি না; কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের থানাগুলিতে এখনো সক্ষমতায় ঘাটতি রহিয়াছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে দ্রুত ছড়াইয়া পড়িতেছে; কিন্তু সেই পরিস্থিতি ত্বরিত গতিতে মোকাবিলায় আমরা কি সক্ষম?
আমরা আমাদের আত্মসমালোচনা অব্যাহত রাখিব, যাহাতে ভবিষ্যতে আমরা যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি দ্রুত ও সহজেই মোকাবিলা করিতে পারি। তবে এই কথাও সত্য যে, আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতো দেশও আজ নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থতার পরিচয় দিতেছে। ব্রিটেনে গত শুক্রবার গির্জায় অতর্কিত ছুরি হামলায় ক্ষমতাসীন দলেরই এমপি ডেভিড অ্যামেস নিহত হইয়াছেন। আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা লাগিয়াই আছে। এখন কথা হইল, আমেরিকা-ব্রিটেন যদি মানুষের জানমাল রক্ষা করিতে না পারে, তাহা হইলে আমরা পারিব কীভাবে? যাহারা শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা করেন, তাহাদের জানা দরকার আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াইতে কত গাড়িঘোড়া ও অস্ত্র-সরঞ্জাম প্রয়োজন? এই জন্য কত বাজেট বা টাকা দরকার? সেই বাজেট কি আমাদের আছে? এই অবস্থায় যাহার যাহার ধর্ম অনুযায়ী চলিলে ও ব্যবস্থা লইলে অনেক অপরাধ কমিয়া আসিতে পারে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী যুদ্ধকালেও অন্য কোনো ধর্মের উপাসনালয়ে হামলা করা যায় না। অন্য ধর্মের দেব-দেবীদের গালি পর্যন্ত দেওয়া যায় না। কুমিল্লায় যাহা ঘটিয়াছে তাহা ন্যক্কারজনক এবং কোনো ধর্মের অনুসারীই তাহা করিতে পারেন না। সুতরাং যাহারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করিতে চাহেন, তাহাদের ব্যাপারে সাধারণ জনগণকেও সতর্ক থাকিতে হইবে। অন্যায় ও দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে গড়িয়া তুলিতে হইবে সামাজিক প্রতিরোধ। ষাটের দশকে আমরা এইরূপ প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে সক্ষম হইয়াছিলাম, তাহা কি এখন পারিতেছি? শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দোষ দিয়াও কোনো লাভ নাই। তবে যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সক্ষম করিয়া অবশ্যই গড়িয়া তুলিতে হইবে।
