কেমন বিশ্বকাপ

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ২২:৩১

ইদানীং খেলাটার যা অবস্থা তাতে ক্রিকেটের মানে হওয়া

উচিত হাঁস। এখনো পর্যন্ত যা সোনার ডিম পেড়ে যাচ্ছে। মুশকিল

হচ্ছে, হাঁস পালকদের সংখ্যা বিশ্বে খুব একটা বাড়েনি। মুষ্টিমেয় কয়েকটা

দেশ সর্বোচ্চ স্তরে ক্রিকেট খেলে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার কুড়ি

শতাংশ খেলাটাকে অনুসরণ করে। তবুও বলা হয় বিশ্বকাপ

g  রূপক সাহা

 

ক্রিকেট কথাটার মানে ঝিঁঝি পোকা। যার দেখা মেলে কম, ডাক শোনা যায় বেশি। আমরা অবশ্য ক্রিকেট বলতে ইংরেজদের একটা খেলা বুঝি। ইদানীং খেলাটার যা অবস্থা তাতে ক্রিকেটের মানে হওয়া উচিত হাঁস। এখনো পর্যন্ত যা সোনার ডিম পেড়ে যাচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে, হাঁস পালকদের সংখ্যা বিশ্বে খুব একটা বাড়েনি। মুষ্টিমেয় কয়েকটা দেশ সর্বোচ্চ স্তরে ক্রিকেট খেলে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার কুড়ি শতাংশ খেলাটাকে অনুসরণ করে। তবুও বলা হয় বিশ্বকাপ। যা শুরু হতে যাচ্ছে আরব দেশে।

উপনিবেশগুলোতে ইংরেজরা যে ক্রিকেট আমাদের শিখিয়েছিল, তা প্রায় বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। এত দীর্ঘমেয়াদি খেলা এখনকার যুগে প্রায় অচল বলা যায়। এই একটা কারণেই ইংরেজরা তাদের প্রতিবেশি দেশগুলোতেও তখন খেলাটাকে ছড়াতে পারেনি। ফরাসি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ইতালীয় এমনকি রুশভাষীরাও কোনো আগ্রহ দেখায়নি। অখণ্ড ভারতের মধ্যে বার্মা দেশও (এখনকার মিয়ানমার) তখন মুখ ফিরিয়ে থেকেছে। ভারত ছাড়া আর যেসব দেশ ক্রিকেট খেলে তারা জনসংখ্যায় কম আয়তনে বড় নয়। ভারতের (১৩৩ কোটি) পরেই আছে বাংলাদেশ (সাড়ে ১৬ কোটি)। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাভাষীরাই সংখ্যাগুরু কি না তা পরিসংখ্যানবিদরা বলতে পারবেন। ওপার এপার বাংলা মিলিয়ে প্রায় ২৭ কোটি।

বিশ্বে প্রতিটি খেলাই গত ২৫-৩০ বছরে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে। ক্রিকেটও তার ব্যতিক্রম নয়। ক্রিকেটকর্তারা কাঠামো বদলেছেন। পাঁচ দিনের খেলা এক দিনে নামিয়ে এনেছেন। ৬০ ওভার, ৫০ ওভার, ২০ ওভার... খেলার মেয়াদ ক্রমশ কমিয়ে আনছেন। এখন শুনছি, ১০০ বলের টুর্নামেন্ট চালু করার চেষ্টাও চলছে। আক্ষেপ হয়, তবুও ক্রিকেট বিশ্বটা সেই ছোটোই রয়ে গেল। সত্যি কথা বলতে কী, আইসিসির সদস্য সংখ্যা ১০৬। তার মধ্যে ১২টি দেশ পূর্ণ সদস্য। বাকি ৯৪টি দেশ নয়। বিশ্বের আর কোনো ক্রীড়া সংগঠনে এই রকম সীমাবদ্ধতা আছে কি না আমার জানা নেই। আইসিসিতে এমন আধা সদস্যও আছে যাদের পাঁচ দিনের টেস্ট খেলার অধিকার নেই, তবে এক দিনের ক্রিকেট খেলতে পারে। এই রকম হাস্যকর কড়াকড়ির কারণেই ক্রিকেটের বিশ্বকাপ আসল কি না তা নিয়ে কথা ওঠে। খেলাটার ইতিহাস অনেক লম্বা কিন্তু ভূগোল সীমিত।

আইসিসির আধা সদস্যদের তালিকায় চোখ বুলালে এমন অনেক দেশের নাম চোখে পড়ে, যারা ফুটবলের বিশ্বকাপ জিতেছে। যেমন—ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি। এসব দেশের ক্রিকেট ইতিহাস কারোর কারোর ১০০-১২৫ বছরের বেশি। যেমন—আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ব্রাজিল প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিল ১৮৮৮ সালে। দুটি দেশই এখন আমেরিকা অঞ্চলে বিভিন্ন স্তরে নিয়মিত টুর্নামেন্ট খেলে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ক্রিকেট বিশ্বে মর্যাদা পায়নি। কবে কী করলে আইসিসির পূর্ণ সদস্য হতে পারবে, কেউ জানেন না।

এই তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামও আছে। এমন সদস্য যারা সদ্য এক দিনের ম্যাচ খেলার অধিকার পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর আগেই পূর্ণ সদস্য হতে চেয়েছিল। কিন্তু তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাইরের কোনো দেশকে এই সম্মান দেওয়া হতো না। আমেরিকানরা ক্রিকেটের কিছু নিয়ম বদলে বেসবল চালু করে দিলেন। আমেরিকানরা সেসব খেলায় খুব দক্ষ, যা হাত দিয়ে খেলতে হয়। ক্রিকেটের চওড়া ব্যাটের বদলে তারা বেসবলের গোলব্যাট বেছে নিলেন। ক্রমে ক্রিকেট অনেক পেছনের সারিতে চলে গেল। বছর ছয়েক আগে আইসিসি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়। নেদারল্যান্ডসের মতো তাদের আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সোনার ডিমের লোভে কিছু ভারতীয় বংশোদ্ভূত জুটে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেটের কমিটিতে এখন তারাই ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। শুনলাম, ফুটবলের মেজর সকার লিগের মতো মেজর ক্রিকেট লিগও না কি চালু হচ্ছে টেক্সাসে।

আমেরিকা অঞ্চল, আফ্রিকা আর এশিয়ার ১৫-১৬টা করে দেশ আইসিসির আধা সদস্য। ৩৩টা দেশ আছে ইউরোপ থেকে। অনুদান পেয়েই এরা সন্তুষ্ট। কবে সীমিত ওভারের বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবে আদৌ পাবে কি না না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফুটবলের বিশ্বকাপে মূল পর্বে টিমের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ক্রিকেট বিশ্বকাপেও বেড়ে ১৬টায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যে আটটা দলকে নতুন করে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়নি। বিশ্বকাপ ফুটবলে যা করতে হয় চ্যাম্পিয়ন দল ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন বা ইতালিকেও। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসি ক্রমান্বয় ঠিক করে দিয়েছে, কোন আটটা দল বিশ্বকাপে মূলবারোয় খেলার সরাসরি সুযোগ পাবে। আমার একটু অবাকই লাগে। মূল পর্বেও দুটি স্তর। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কাকে কয়েকটা ম্যাচ বেশি খেলতে হবে কেন? ফুটবলের বিশ্বকাপে মূল পর্বে যারা খেলে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য তাদের সবাইকে কিন্তু সাতটা করে ম্যাচ খেলতে হয়।

ক্রিকেটবোদ্ধাদের মুখে প্রায়ই শুনে থাকি আধা সদস্য দেশগুলোর ক্রিকেট মান খারাপ। বিশ্বকাপে খেলার মতো নয়। কথাটা হয়তো ঠিক। কিন্তু খেলার মানোন্নয়নে ফিফা যা করেছে তার সিকি ভাগও আইসিসি কেন করেনি? গোঁজামিল দিয়ে সংস্থা তৈরি করে কর্তাদের সোনার ডিম কুড়োনোর তাগিদ ক্রিকেট খেলাটা বাড়তে দিল না। দেশে দেশে আইপিএল ধরনের টুর্নামেন্ট হয়তো ক্রিকেটারদের ব্যাংক ব্যালান্স বাড়াচ্ছে। কিন্তু বিরাট বিপদ ডেকে আনছে। এমন একটা সময় আসবে যখন ক্রিকেটাররা দেশের হয়েও খেলতে চাইবে না। আমার মনে হয় ক্রিকেট খেলাটা বাঁচিয়ে রেখেছে টিভি। খেলার মধ্যে এত বিরতি, এত বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ আর কোনো খেলায় নেই। স্পন্সররা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। টিভি স্বত্ব থেকে আয়ে অবশ্য ঘাটতি পড়েনি। কিন্তু বিপদের কথা সর্বোচ্চ স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে আসছে। নাটক করে ক্রিকেটপ্রেমীদের আর ভোলানো যাবে না। ক্রিকেট বিশ্ব আরো বড় করার ব্যাপারে এখনই ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত আইসিসির।

 

লেখক : সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক, আনন্দবাজার পত্রিকা এবং

সাবেক সম্পাদক, আনন্দলোক