সেই জয়ের স্মৃতি

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ২২:৩৪

g  পবিত্র কুন্ডু

 

এখন চারদিকে টি-২০ ক্রিকেট মানে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটের জয়ডঙ্কা বাজে। আর এটা শুনে ও দেখে মনে হয়, আধুনিক ক্রিকেটের পরমার্থই হয়ে দাঁড়িয়েছে টি-টোয়েন্টি। টি-টোয়েন্টি ছাড়া ক্রিকেটের পৃথিবী অচল। আর মাত্র কদিন পর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সপ্তম বিশ্বকাপ। করোনা ভাইরাস নামের এক মহামারি ২০২০ সালে পৃথিবীর ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়লে বিশ্বকাপ হয়ে যেত ৮টি। অথচ মাত্র ২০টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ প্রসবের পর আইসিসি যখন এটির প্রথম বিশ্বকাপের বাঁশি বাজিয়ে দিল, অনেকেই নাক সিঁটকে ছিল, বাঁকা কথা বলেছিল। পায়জামা ক্রিকেট, হাইব্রিড ক্রিকেট, নাচুনে ক্রিকেট—কত যে নাম দেওয়া হয়েছিল টি-টোয়েন্টির!

খেলাটির বর্তমান মহাতীর্থ ভারত প্রথম বিশ্বকাপে তো অংশগ্রহণই করতে চায়নি। আমাকেও একটু অনিচ্ছা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে হয়েছিল প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কভার করতে। ভেবেছিলাম ক্রিকেটের নতুন এক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যেহেতু প্রত্যাশার বিশাল চাপ নিয়ে যাচ্ছে না, খেলাটা উপভোগ করা যাবে। ফুরফুরে মেজাজে ইচ্ছেমতো হাত খুলে লেখাও যাবে। তা বলতে দ্বিধা নেই, খেলার মধ্যে নানারকম উদ্ভাবনী দেখে আনন্দ তো পেয়েছিলামই, বাংলাদেশের খেলা থেকেও নিতে পেরেছিলাম রসের আস্বাদ। আর ক্রিকেটের একটি প্রথমের মধ্যে অনেকগুলো প্রথমের হয়েছিলাম সাক্ষী। বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচটি ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। একদা ক্রিকেটের সবচেয়ে পরাক্রমশালী দলটির ছন্নছাড়া অবস্থা অনেক বছর ধরেই। অন্য বড় দলগুলোর কাছে তারা নাকানিচুবানি খায় প্রায় সময়ই। ক্রিকেট বিশ্বেই ফিসফিসানি এ রকম ছিল যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাংলাদেশের কাতারে নেমে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ তবুও কিছুতেই জয়ের দেখা পাচ্ছিল না ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে।

বাংলাদেশের মুখোমুখি হলেই ক্যারিবীয়দের নীল রক্ত যেন চলকে উঠত। অবশেষে বাংলাদেশ প্রথম জয়টি পায় আশরাফুলদের হাত ধরে, প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই। কী অসাধারণ সেই জয়! অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলই জয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সামনে থেকে। অনুমান বা ঘটনা যে ক্রিকেটের একটি বিন্দুতে সব সময় মেলে না, সেটির এক টুকরা প্রমাণ এই ম্যাচ। আগের ম্যাচেই অর্থাত্ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের নাকের জল, চোখের জল এক করে দিয়ে সেঞ্চুরি করেন ক্রিস গেইল। তার সঙ্গে ডেভন স্মিথের শতরানের উদ্বোধনী জুটির সুবাদে ২০৫ রান করেও সে ম্যাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারতে হয় স্বাগতিকদের কাছে। সেই থেকেই সবাই ধারণা করেছিল, আহত বাঘের মতো বাংলাদেশকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে গেইলদের দল। অথচ ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে সেদিন ঘটনা ঘটেছিল উলটোটা, ছয় উইকেট ও দুই ওভার হাতে রেখেই ম্যাচ জিতে নেয় বাংলাদেশ।

ডেটলাইন ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৭। জোহানেসবার্গ।

আগের দিন পিচে বেশি পানি দেওয়ায় তা ছিল স্যাঁতসেঁতে। খেলা শুরু হতে তাই দেরি হয় এক ঘণ্টা। টস জিতে আশরাফুল দ্বিতীয় চিন্তা করেননি, দল নামিয়ে দেন ফিল্ডিংয়ে। ম্যাচের তৃতীয় বলেই বাঁহাতি পেসার সৈয়দ রাসেল শূন্য রানে শিকার বানান গেইলকে। অফ স্টাম্পের বাইরে সামান্য খাটো লেন্থের বল, গেইল কাট করে সরাসরি তুলে দেন পয়েন্টে অলক কাপালির হাতে। রাসেল ও অলককে ঘিরে উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ দল জয়ের সুগন্ধ পেয়ে গেছে। তবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সমধিক পরিচিত এই ফেরিওয়ালা ছাড়াও সামর্থবান ব্যাটসম্যান বা বিগ হিটারের তো অভাব নেই ক্যারিবীয় দলে। ওপেনার ডেভন স্মিথের ৫২ বলে ৫১, শিবনারাইন চন্দরপলের ৩১ বলে ৩৭, মারলন স্যামুয়েলসের ১৪ বলে ২৭ এবং ডোয়াইন স্মিথের ৭ বলে ২৯ রানের তাণ্ডব তাদের পৌঁছে দেয় ৮ উইকেটে ১৬৪ রানে। আশরাফুল নিজের লেগ স্পিন বোলিং সামর্থ্যের মহিমা কীর্তন করতে গিয়ে চার ওভারে রান দিয়ে ফেলেন ৫৫ রান, যা ছিল সে সময়ে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দ্বিতীয় খরুচে বোলিং। শেষ পর্যন্ত বল হাতে ত্রাতার ভূমিকায় নেমে সাকিব আল হাসান তার বাঁহাতি স্পিনে চার ওভারে ৩৪ রান দিয়ে তুলে নেন চার উইকেট, যা বাংলাদেশের হয়ে কোনো বোলারের প্রথম চার উইকেট শিকার। জোহানেসবার্গের খররোদে ১৬৫ রানের লক্ষ্য কম ছিল না। কিন্তু ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামকে বিস্ময়ে ডুবিয়ে বাংলাদেশ লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে দুই ওভার বাকি থাকতেই।

সর্বোচ্চ অপরাজিত ৬২ রান করেন আফতাব আহমেদ। ক্যারিবীয় বোলারদের শাসন করা ইনিংসই ছিল এটি তিন নম্বরে নামা এই ব্যাটসম্যানের। তবে তার চেয়ে এক রান কম করেও নায়ক সেদিন মোহাম্মদ আশরাফুল। এমন ইনিংস অনেক ব্যাটসম্যানের কাছে আজীবন স্বপ্নের মধ্যে থেকে যায়। প্রতিপক্ষ অধিনায়ক রামনরেশ সারওয়ানের লেগব্রেকে কাভারে গেইলের হাতে ক্যাচ দেওয়ার আগে ৬১ রান করতে আশরাফুলের খরচ হয় মাত্র ২৭ বল। যাতে ছিল সাতটি চার, তিনটি ছক্কা। সে সময়ের অন্যতম সেরা দ্রুতগতির বোলার ফিদেল এডওয়ার্ডসকে শর্ট আর্ম পুল করে ফাইন লেগের ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে ২০ বলে তুলে নেন ফিফটি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দ্রুততম ফিফটির এ রেকর্ডটি অবশ্য কদিন পর এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই ভেঙে দেন ভারতের যুবরাজ সিং। ১২ বলে ফিফটি করার পথে যুবরাজ ইংল্যান্ড ফাস্ট বোলার স্টুয়ার্ট ব্রডের করা এক ওভারে মারেন ছটি ছক্কা। মনে পড়ে, আশরাফুল আউট হওয়ার পর ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো ইনিংসটিকে বর্ণনা করেছিল এভাবে—ভায়োলেন্ট, ব্রুটাল অ্যান্ড ইনোভেটিভ (হিংস্র, নির্মম ও উদ্ভাবনী)। ওয়ান্ডারার্সের প্রেসবক্সে আশরাফুলের ব্যাটিং আমাকে নোট রাখতেই ভুলিয়ে দিয়েছিল। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, আসলেই কি চোখের সামনে ঘটছে এসব! দলীয় দুই রানেই প্রথম বিদায় নেন ওপেনার নাজিমউদ্দিন, ২৮ রানে আরেক ওপেনার তামিম ইকবাল। এরপর ক্রিজে নেমেই ড্যারেন পাওয়েলের প্রথম বল উইকেটকিপার ও প্রথম স্লিপের ফাঁক দিয়ে আপার কাট করে চার, দ্বিতীয় বল ফাইন লেগে পুল করে চার, তৃতীয় বল মিড-অন দিয়ে পুল করে চার, চতুর্থ বল অফে খেলে দুই, পঞ্চম বল ডট, ষষ্ঠ বল কভার পয়েন্টের ওপর দিয়ে আবার চার মারেন আশরাফুল। ঐ ওভারের ১৮ রানই আশরাফুলের ব্যাট থেকে। প্রেস বক্সে তখন দুটো মাত্র শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছিল—ওয়াও আশরাফুল, ওয়াও আশরাফুল! আর সীমানার ধারে যেখানে ঘাসের জমির গ্যালারি, সেখানে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছিল বল কুড়োনোর আনন্দ।

ফাস্ট বোলার রবি রামপলের বলে ড্রাগ ফ্লিকে আশরাফুল যখন ফাইন লেগের ওপর তুলে মেরেছেন, প্রেস বক্সের সমবেত বিস্ময় জমা পড়ে ঈশ্বরের দরবারে—ওহ, মাই গড! প্রথম ম্যাচেই এমন এক জয়ের পর বাংলাদেশকে নিয়ে সৃষ্টি হয় তুমুল আগ্রহ। এই একটি জয়েই সুপার এইটে উঠে যাওয়া বাংলাদেশ অনেকের কাছেই তখন টুর্নামেন্টের ডার্ক হর্স। কিন্তু তারপর থেকে ডার্ক মানে কেবলই আঁধার, যা বাংলাদেশের চিরসঙ্গী। আঁধার চিরে আলো আনার অভিযান চলছে তো চলছেই। কেটে গেছে ছয়টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জয়টিই বড় দলের বিপক্ষে প্রথম এবং একমাত্র জয়ের স্মৃতি হয়ে রয়েছে। সুখের স্মৃতি কুড়োতে বাংলাদেশকে ফিরে যেতে হয় ১৪ বছর আগের ঐ ম্যাচটির কাছেই। বড় দলের বিপক্ষে বাকি ২০ ম্যাচের স্মৃতি যে শুধুই ব্যর্থতার ধারাপাত।

 

লেখক :সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক