g রেজওয়ান উজ জামান
একটা বিশ্বকাপের জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা। ভার্চুয়ালি তিন দেশ ঘুরে, এক দেশকে স্বাগতিক মেনে, অন্য দুই দেশে হচ্ছে সত্যিকারের বিশ্ব আসর। টি-টোয়েন্টির ঝড়ের মতোই ওলট-পালট আইসিসির হিসাব-নিকাশ।
২০১৬-তে যখন শেষবার বিশ্বকাপ হয়েছিল ভারতে, তখন দুই বছর পর পর এই আসর আয়োজনের পথেই হাঁটছিল সংস্থাটি। কিন্তু হঠাত্ কি হলো; আইসিসি ঠিক করল চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আয়োজনের। সেই হিসাবে ২০২০-তে বিশ্ব আসর হবে অস্ট্রেলিয়ায়। ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি থেকে নাম বদলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও তখনকার সিদ্ধান্ত। এরপর এলো করোনা। বিদায় নিল ক্রিকেট। বিশ্বকাপের নাম নেওয়ারও সুযোগ নেই।
বছরখানেক লাগল ধাতস্থ হতে। ২০২০ পেরিয়ে ততদিনে ২০২১। তারপর আবারও চিন্তা ফিরে এলো ক্রিকেটের। অস্ট্রেলিয়া বলল—তাদের আসর, ভারত বলল—আগের সিদ্ধান্তে ২০২১-এতো তাদেরই করার কথা। ক্রিকেট দুনিয়ায় ভারতের চাওয়াকে উপেক্ষা করে সাধ্য কার!
আইসিসির সভায় সিদ্ধান্ত হলো ভারতই স্বাগতিক। ২০২২-এ দেখা হবে অস্ট্রেলিয়ায়। ভারত বলে আপত্তি জানালো পাকিস্তান। বাধলো বিপত্তি। তবে সেটাই কারণ নয় ভারত থেকে সরে যাবার। করোনার সংক্রমণ আর এত বড় ঝাক্কি সামলাতে ঝুঁকি নিতে চায়নি বিসিসিআই। তাই স্বাগতিক হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু বিশ্বকাপ যখন শুরু হবে তার আগে আছে আইপিএল। আমিরাতকে প্রস্তুতি করতে কটা দিন সময় চাই। এগিয়ে এলো প্রতিবেশি দেশ ওমান। কিন্তু অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জার্সিতে থাকবে ‘আইসিসি টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ ইন্ডিয়া ২০২১’ লেখা। এটা নিয়েও কম নাটকীয়তা হয়নি। পাকিস্তানতো তাদের জার্সিতে ইন্ডিয়ার জায়গায় আরব আমিরাতের নাম লিখে বিপদে পড়েছিল। বাধ্য হয়েছে তা পরিবর্তন করতে।
১৬ দলের টুর্নামেন্ট সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে আইসিসিকে। কখনো কখনো তাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব মেলানো দুস্কর। এই যেমন দল ঘোষণার ডেডলাইন ছিল ১৪ সেপ্টেম্বর। কিন্তু আবার ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দল বদলানো যাবে। সেই সুযোগটা নিল অনেক দলই। কিন্তু শ্রীলঙ্কা যেন একধাপ এগিয়ে। ১৫ ক্রিকেটারের চার জনকেই বদলে ফেলল। ভারত সেই ডেডলাইন শেষে বদলাল এক ক্রিকেটার।
কিন্তু মাঠের খেলা শুরু হলে সবাই ভুলে যাবে এসব, মজবে ক্রিকেট উন্মাদনায়। যেখানে হাসি-কান্না-আনন্দ-বেদনা সবই আছে।
আছে প্রিয় বাংলাদেশ। তাই বিশ্বকাপটা আমাদের নিজেদের। যেকোনো খেলার মতো, ভালো খেললে কোনো কথাই নেই। খারাপ খেললে রাগ-কষ্ট-দুঃখ এসে ভিড় করে মনের কোণে। পরক্ষণেই অবশ্য তা দূরে চলে যায়।
একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ২০০৫ সালে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনল নতুন সংস্করণ টি-টোয়েন্টি। দুই বছরের মধ্যে তারই বিশ্ব আসর। পরের এক যুগে হয়েছে ছয়টি টুর্নামেন্ট। কখনোই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। আগামীতেও নির্দিষ্ট নয় এর গতিপথ। কিন্তু টি-টোয়েন্টি শিকড় গেড়েছে দেশে-দেশে।
২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেয় প্রথম আসর আয়োজন করে। প্রথম বলে চার আর প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি করে টি-টোয়েন্টি ধামাকার জানান দেন খেলাটির জীবন্ত কিংবদন্তী ক্রিস গেইল। প্রথম চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ভারতও আলাদা। গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের সঙ্গে নাটকীয় টাই করা ভারত, ফাইনালে তাদেরই হারায়। যুবরাজ সিং-এর ছয় বলে ছয় ছক্কার ঘটনাটিও প্রথম আসরের। দুই বছর পর, ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ড হলো স্বাগতিক। এবার আক্ষেপ ঘুচলো পাকিস্তানের। হাতে উঠল ট্রফি। তবে স্বাগতিকদের হারিয়ে নেদারল্যান্ডস যে ঝলক আর চমক দেখিয়েছিল তা এখনো অমলীন। ফাইনালে শ্রীলঙ্কা জিততে না পারলেও, তিলকারত্নে দিলশান ছিলেন টুর্নামেন্ট সেরা।
আফ্রিকা থেকে ইউরোপ হয়ে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে পাড়ি জমায় বিশ্বকাপ। প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েই শিরোপা জিতে নেয় ইংল্যান্ড। কেভিন পিটারসেন যেন তার সেরা সময়ে ছিলেন ২০১০ আসরে। ২০১২-তে এশিয়ায় প্রথম বার আসে বিশ্বকাপ। এরপর টানা তিন আসর এখানেই। শ্রীলঙ্কায় চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
আগের আসরের স্বাগতিকদের পরের আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ধারাটা ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর ধরে রাখে শ্রীলঙ্কা। ২০১৪-তে স্বাগতিক বাংলাদেশ। ফাইনালে ভারতকে হারালেও টুর্নামেন্টটা চিরস্মরণীয় রঙ্গনা হেরাথের জন্য। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে মাত্র ৩ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন এই বাঁহাতি স্পিনার।
পাঁচ বছর আগে শেষ আসরে ভারত ছিল স্বাগতিক। চ্যাম্পিয়ন আবারও সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অন্তত এই ফরম্যাটের রাজা তারাই। ফাইনালে কার্লোস ব্রাথওয়েটের টানা চার ছয়, ভোলার নয় কোনোদিন। এই বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার ২২৯ রানকে টপকে রেকর্ড গড়েছিল ইংল্যান্ড। আর ক্রিকেটের কুলীন দেশ অস্ট্রেলিয়া; একবার ফাইনাল খেললেও শিরোপা এখনো অধরা। অনিশ্চয়তার ক্রিকেট, টি-টোয়েন্টিতে তাই আরো অনিশ্চিত।
লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, চ্যানেল টোয়েন্টি ফোর
